সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাবিত রিজওয়ান
সম্প্রতি তরুণ কবি মুহাম্মদ আবু রিসাত-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন সাবিত রিজওয়ান। খোলামেলা সেই আড্ডায় কবি কথা বলেছেন তাঁর কবিতাভাবনা, সমাজচেতনা এবং সমকালীন সাহিত্য নিয়ে। তাঁদের কথোপকথনের মূল অংশটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
রিজওয়ান: আপনার কাছে কবিতা কী?
রিসাত: কবিতা আমার কাছে সাহিত্যের রানি।
রিজওয়ান: এমন কোনো মুহূর্ত কি আছে, যখন মনে হয়েছে কবিতা ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়?
রিসাত: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই একটা সময় মনে হতো যে কবিতা না লিখলে যেন আমার দিনটা ভালো কাটছে না বা এটা না লিখলে আমার নিজের মনের ভাব হয়তো প্রকাশ পাচ্ছে না। এমনও দিন কেটেছে বা রাত কেটেছে। কবিতা লিখতে লিখতে আমার এই কবিতা দিয়ে অনেক সময় অনেকেই অনুপ্রাণিত করতাম আবার কখনো কখনো অনুপ্রেরণা দিতাম বোঝাতাম আমার লেখনের মাধ্যমে। কখনো আমার বিপ্লবের হাতিয়ার হয়েছে কখনো আমার প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে কখনো আমার মনের ভাব বোঝানোর একটা মাধ্যম হয়েছে।
রিজওয়ান: একজন কবির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী বলে মনে করেন?
রিসাত: আমরা অনেকেই জানি বা অনেকেই অনেক সময় একটা প্রবাদ বলে থাকি যে লেখকরা বা কবিরা জাতির বিবেক। সেই চিন্তাধারা থেকেই এবং এই প্রশ্নের আলোকে আমি বলব যে একজন কবির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রথমে নিজেকে একজন সৎ ন্যায় নীতি বান আদর্শের একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা এবং অন্যের সাহায্যে নিজেকে নিয়োজিত করা। সমাজে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলা।
রিজওয়ান: আপনার কাছে একটি ভালো কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
রিসাত: আমার কাছে যে কবিতা হৃদয়কে স্পর্শ করে, চিন্তাকে জাগ্রত করে এবং শৈল্পিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে পাঠকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, সেটিই একটি ভালো কবিতা।
রিজওয়ান: কবিতা কি সমাজ পরিবর্তনের শক্তি রাখে?
রিসাত: হ্যাঁ তা তো অবশ্যই তবে কবিতা নিজে সমাজ পরিবর্তন করে না, কিন্তু মানুষের মন ও বিবেককে জাগিয়ে সমাজ পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
রিজওয়ান: আপনার লেখায় কোন বিষয়গুলো বারবার ফিরে আসে?
রিসাত: আমি মূলত আধ্যাত্মিক কবিতা লিখতে বেশি পছন্দ করি পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তুলতে বিপ্লবী বিদ্রোহী মূলক কবিতা লিখি। ইসলামিক সামাজিক প্রাকৃতিক দেশপ্রেমের কবিতা লিখি। মাঝে মাঝে প্রেম বিরহ গুলো ও ফুটে ওঠে। তবে একজন মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সামাজিক কবিতাগুলোই আমার লেখাতে বেশি বেশি ফুটে ওঠে বারবার ফিরে আসে অর্থাৎ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি বা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি।
রিজওয়ান: প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ ও রাজনীতি, এর মধ্যে কোন বিষয় আপনাকে বেশি টানে?
রিসাত: সামাজিক কবিতাগুলো আমাকে বেশি টানে।
রিজওয়ান: পাঠকের প্রশংসা ও সমালোচনা, কোনটি একজন কবিকে বেশি সমৃদ্ধ করে?
রিসাত: এক্ষেত্রে আমি বলব প্রশংসা একজন কবিকে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেয়, আর গঠনমূলক সমালোচনা তাঁকে আরও উন্নত ও পরিণত কবিতা রূপান্তর করে। প্রকৃত সমৃদ্ধি আসে এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ে। তাই আমি বলব প্রশংসা ও সমালোচনা উভয় খুবই প্রয়োজন। নচেৎ ইতিবাচক প্রভাব পড়া বড়ই দুষ্কর।
রিজওয়ান: বর্তমানে বাংলা কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক কী?
রিসাত: আমার কাছে বর্তমানে বাংলা কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো বিষয়বৈচিত্র্য ও সময়সচেতনতা—এটি ব্যক্তি, সমাজ ও সমকালীন বাস্তবতাকে একসঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম।
রিজওয়ান: আবার সবচেয়ে দুর্বল দিক কী বলে মনে করেন?
রিসাত: আমার মনে হয় বর্তমান বাংলা কবিতার সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো মৌলিকতার সংকট ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে গভীর চিন্তা ও শৈল্পিক পরিশীলনের চেয়ে দ্রুত প্রকাশের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
রিজওয়ান: একজন নতুন কবির লেখা পড়লে প্রথমে কোন বিষয়টি লক্ষ্য করেন?
রিসাত: একজন নতুন কবির লেখা পড়লে আমি প্রথমে ভাবের মৌলিকতা ও ভাষার স্বকীয়তা লক্ষ্য করি। কারণ কবির নিজস্ব কণ্ঠস্বরই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
রিজওয়ান: কবিতায় ছন্দ ও অলঙ্কার এর গুরুত্ব আজও আগের মতো আছে কি?
রিসাত: হ্যাঁ, ছন্দ ও অলঙ্কারের গুরুত্ব আজও আছে। তবে আধুনিক কবিতায় কঠোর ছন্দের চেয়ে ভাব, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির গুরুত্ব বেড়েছে। তবুও ছন্দ ও অলঙ্কার কবিতার সৌন্দর্য, সুরমাধুর্য ও আবেগ প্রকাশকে সমৃদ্ধ করে।
রিজওয়ান: আপনার কোনো অপছন্দের সাহিত্যিক প্রবণতা আছে?
রিসাত: হ্যাঁ, মৌলিকতার অভাব ও অকারণ দুর্বোধ্যতার প্রবণতা আমার কাছে সাহিত্যের সবচেয়ে দুর্বল দিক বলে মনে হয়।
রিজওয়ান: এমন কোনো কবিতা আছে কি, যা আপনার জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে?
রিসাত: আমি মূলত সবসময়ই কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহির লেখা সবচেয়ে বেশি পাঠ করি। কবি জসিমউদ্দীন, কবি আল মাহমুদ, কবি হেলাল হাফিজ এদের গুলোও পড়া হয়। তবে বেশিরভাগ কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা গুলায় পড়া হয়।
রিজওয়ান: লেখার সময় আপনি পাঠককে মাথায় রাখেন, নাকি নিজের অনুভূতিকেই গুরুত্ব দেন?
রিসাত: উভয় বিষয় মাথায় রেখে লেখার চেষ্টা করি।
রিজওয়ান: আপনার মতে কবি কি জন্মগত, নাকি তৈরি হয়?
রিসাত: স্থান কাল পাত্র ভেদে উভয় হয়ে থাকে। যদি বলা হয় জন্মগত কবি, তবে এটি আধ্যাত্মিক বিষয়। যা অনেকেই কল্পনাতে আনতে পারে না বা কখনো পারবেও না। এটা গোপন উপলব্ধ বিষয়। আর এটা তৈরি হয় পারিপার্শ্বিক দিক থেকেই। বিভিন্ন কারণ পরিস্থিতির প্রভাবেই হয়ে থাকে। তাই কবি দুটি হতে পারে—একটি জন্মগত আরেকটি উদীয়মান।
রিজওয়ান: সাহিত্য পুরস্কার একজন কবির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রিসাত: এটা বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। পরম পাওয়া জীবনে পথ চলার এক নতুন মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে।
রিজওয়ান: প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কবিতার ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
রিসাত: ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তবে হ্যাঁ, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তার মাধ্যমে সরাসরি কবিতা লিখে নিয়ে সেটা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া এটা এক ধরনের জালিয়াতি। তাই সাবধান। তার থেকে হয়তো সহয়তা গ্রহণ করা সম্ভব, তবে সরাসরি তার লেখা ব্যবহার করা এটা একটা সুন্দর সাহিত্যিক মনকে নষ্ট করা।
রিজওয়ান: আপনার অপ্রকাশিত কোনো স্বপ্ন আছে, যা এখনো পূরণ হয়নি?
রিসাত: মানুষের সকল স্বপ্নই তো অপূর্ণ থেকে যায় যা স্থান কাল পাত্র ভেদে ধাপে ধাপে হয়তোবা পূরণ হয়ে থাকে। ইচ্ছে বা স্বপ্ন তো আছে অনেক তবে কোন কিছুই এখনো হাসিল হয়নি। তবে ইনশাআল্লাহ আশা আছে মহান রব পূরণ করবেন, খুব তাড়াতাড়ি। সেজন্য দোয়া প্রার্থী।
রিজওয়ান: যদি একজন তরুণ কবিকে মাত্র একটি উপদেশ দিতে হয়, তাহলে কী বলবেন?
রিসাত: প্রথমে পড়তে হবে, প্রচুর পরিমাণে পড়তে হবে। পড়ার কোন বিকল্প নেই। সেটা প্রবীণ লেখকের লেখা হতে পারে বা নবীন লেখক এর লেখা হতে পারে। কিন্তু পড়তে হবে প্রচুর পরিমাণে। না পড়লে প্রাথমিক ধারণাও আসবে না এবং লেখার কোন ধারণা ও পাওয়া যাবে না। তাই পড়তে হবে, অলসতা চলবে না বা অসৎ উপায় অবলম্বন করা চলবে না।
রিজওয়ান: শেষ প্রশ্ন, আপনার কাছে জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি কবিতা?
রিসাত: হাহাহা হাস্যকর একটি প্রশ্ন। জীবন যদি না থাকে তবে কবিতা দিয়ে কি করব। তবে কবিতা হল আত্মার খোরাক সাহিত্যের প্রাণ, সাহিত্য প্রেমিক মানুষদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। তাই দুটিই আমার কাছে প্রিয়।
রিজওয়ান: ধন্যবাদ এতক্ষণ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।
রিসাত: আপনাকেও অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার জন্য রইল মন থেকে দোয়া সতত শুভকামনা।