খুলনা প্রতিনিধি:
দীর্ঘ দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে খুলনা আর্ট কলেজের ২০০২ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এক আবেগঘন পুনর্মিলনীতে মিলিত হয়েছেন। ব্যস্ত কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান পেরিয়ে আবারও এক ছাদের নিচে ফিরে পাওয়ার এই মুহূর্ত যেন সবাইকে ফিরিয়ে নিয়েছিল ছাত্রজীবনের সেই রঙিন দিনগুলোতে।জানা যায়, কয়েক দিন আগে প্রিয় সহপাঠী চিত্রশিল্পী হীরা বিশ্বাস একটি মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সহপাঠীদের পুনরায় একত্রিত করার আন্তরিক উদ্যোগ নেন। অল্প কয়েকজন বাদে প্রায় সবাইকে সেই গ্রুপে যুক্ত করা সম্ভব হয়। সেই উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় দীর্ঘ দুই যুগ পর সবাইকে নিয়ে একটি পুনর্মিলনীর ভাবনা।এ সময় সহপাঠী সাবিনা রহমান ঋতু আন্তরিকভাবে বলেন, “আমি নতুন বাড়ি করেছি। তোরা সবাই যদি আমার বাড়িতে আসিস, আমি খুব খুশি হব।” তাঁর এই আন্তরিক আহ্বানেই ২৩ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেলে করিম নগর আলী হোসেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে সম্রাট লেন ২১/৪-এর ক নম্বর বাসভবনে পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়।
দীর্ঘ দুই যুগ পর একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার সেই মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। শুরুতেই সবাই কুশল বিনিময় করেন, পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং নিজেদের বর্তমান জীবন, কর্মব্যস্ততা ও শারীরিক সুস্থতার কথা ভাগাভাগি করেন। উপস্থিত সবাই অনুভব করেন, যেন সময় আবার তাঁদের ছাত্রজীবনে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী চন্দ্রশেখর দাস, পরিবেশবান্ধব মৃৎশিল্প কেন্দ্র, তালা, সাতক্ষীরা; চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, খুলনা আর্ট একাডেমি; চিত্রশিল্পী হীরা বিশ্বাস, পিএইচডি (আমেরিকা); চিত্রশিল্পী সাবিনা রহমান ঋতু, সহকারী শিক্ষিকা, খুলনা কলেজিয়েট স্কুল, সোনাডাঙ্গা; চিত্রশিল্পী মেহেদি হাসান হিমু, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, হিমালয় আর্ট একাডেমি; চিত্রশিল্পী এস পান্থ, পরিচালক, ক্যানভাস আর্ট একাডেমি এবং চিত্রশিল্পী শিরীন, সহকারী পরিচালক, ক্যানভাস আর্ট একাডেমি। সবারই অভিমত ছিল, আরও সহপাঠী উপস্থিত থাকলে আনন্দ আরও পরিপূর্ণ হতো, তবুও এই মিলন তাঁদের হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছে।অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস উপস্থিত প্রতিটি সহপাঠীকে একটি করে গোলাপ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে বিদেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসা সহপাঠী চিত্রশিল্পী হীরা বিশ্বাসকে উপস্থিত সবাই ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস রচিত খুলনা আর্ট কলেজের স্মৃতি, বন্ধুত্ব ও ছাত্রজীবনকে ঘিরে লেখা একটি নতুন গান। গানটি সাউন্ড সিস্টেমে উপস্থিত সবার জন্য পরিবেশন করা হয়। গানটির সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন প্রবীর শীল। গানটি শোনার পর উপস্থিত সবাই করতালির মাধ্যমে আন্তরিক প্রশংসা জানান এবং অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।এরপর একে একে সবাই দীর্ঘ দুই যুগ পর একে অপরকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন। কেউ স্মৃতিচারণ করেন, কেউ হাস্যরসের গল্প শোনান, আবার কারও চোখের কোণে জমে ওঠে আবেগের অশ্রু। বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রাণবন্ত আড্ডা, হাসি-আনন্দ, স্মৃতিচারণ এবং সুস্বাদু আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে কেটে যায় এক অনন্য সময়। উপস্থিত সবার মতে, দিনটি তাঁদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে উল্লেখ করেন। তিনি উপস্থিত সকল সহপাঠীর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সময়ে সবাই নিজ নিজ পরিবার, কর্মজীবন ও নানাবিধ দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার মাঝেও যারা মূল্যবান সময় বের করে এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁরাই এই মিলনমেলার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান সেইসব বন্ধুদের, যারা প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝড় ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে নড়াইল ও সাতক্ষীরা থেকে ছুটে এসেছেন। তাঁদের এই আন্তরিক উপস্থিতি বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় ও অর্থবহ করেছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যাঁরা বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও বাস্তব কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তাঁদের প্রতিও রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। আশা করা হচ্ছে, আগামী আয়োজনে আরও বৃহত্তর পরিসরে সকল সহপাঠীকে একত্রিত করা সম্ভব হবে।এই সুন্দর পুনর্মিলন আয়োজনের জন্য তিনি বিশেষভাবে চিত্রশিল্পী হীরা বিশ্বাস, সাবিনা রহমান ঋতু এবং দুলাভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁদের আন্তরিকতা ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার কারণেই দীর্ঘদিন পর সহপাঠীরা আবার একে অপরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন।বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় ঋতুর স্নেহের মেয়ে মামনি এ্যানার কথা। আন্তরিক আপ্যায়ন, সৌজন্য, হাসিমাখা ব্যবহার ও আন্তরিকতায় তিনি উপস্থিত সবার মন জয় করেছেন। উপস্থিতদের অনুভূতি, তিনি তাঁর মা-বাবার সুন্দর গুণাবলিই উত্তরাধিকারসূত্রে ধারণ করেছেন। তাঁর আন্তরিক উপস্থিতিও পুরো আয়োজনকে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে তুলেছে।পুনর্মিলনী শেষে সবাই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, বন্ধুত্বের এই অটুট বন্ধন আজীবন অম্লান থাকবে এবং এই পুনর্মিলনের রঙিন স্মৃতিগুলো হৃদয়ের ক্যানভাসে চিরকাল অঙ্কিত হয়ে থাকবে।