• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম:
জগন্নাথপুরে অল টাইম ক্লিনের প্রথম সাংগঠনিক টি-শার্ট উন্মোচন কবিতাঃ নারী অধিকার সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদে জগন্নাথপুর সাংবাদিক ফোরামের নিন্দা ফরিদপুরে সরকারি কার্ড দেওয়ার টোপ দিয়ে বিধবাকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত পলাতক এআই এবং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ: আশীর্বাদ নাকি নতুন সংকট? তুরস্কের কাছে ১০০ কোটি ডলার ও সুন্দরী স্ত্রী দাবি উগান্ডার সেনাপ্রধানের, সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি রমনা বটমূলে বোমা হামলার ২৫ বছর: এখনো ঝুলে আছে বিস্ফোরক মামলার বিচার পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৬ কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তন: আইজিপি’র নির্দেশ পহেলা বৈশাখে বৃষ্টির শঙ্কা কোথায়? জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন ফ্রান্স যুবদলের সহ- সাধারণ সম্পাদক এম ফখরুল ইসলাম ফয়েজ

সাবিত রিজওয়ানের অসমাপ্ত লিখনি

Tufan / ২০ Time View
Update : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ায় তুফান নওগাঁর নবযাত্রা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। এই কলেজে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসে, অনেকের স্বপ্নই থাকে এখানে ভর্তি হওয়ার। শহরের সুযোগ-সুবিধা ও ভালো পড়াশোনা করার জন্য তুফান মেসে থেকে থাকার পরিকল্পনা করেছে।

 

ভর্তির দিনটি ছিল ব্যস্ত এবং অদ্ভুত রকম উত্তেজনাপূর্ণ। প্রশাসনিক ভবনের দোতলার একটি কক্ষে নতুন শিক্ষার্থীদের বসিয়ে ফরম পূরণ করতে বলা হলো। বলা হলো, সঠিক তথ্যটাই লিখবেন। এক বেঞ্চে দুইজন করে বসা—এমন নিয়ম। তুফানও একটি বেঞ্চে একা বসে ফরম দেখছে।

 

ঠিক তিন-চার মিনিট পর দরজার দিক থেকে একটি মেয়ে ভেতরে ঢুকল। চারপাশে তাকিয়ে সে বুঝল প্রায় সব বেঞ্চ ভরা। কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকার পর সে তুফানের পাশে ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ল। হাতে ছিল ফরম আর একটি নীল রঙের কলম।

 

মেয়েটিও কিছুক্ষণ ফরমে মন দিল। কক্ষে তখন শুধু কাগজ উল্টানোর শব্দ আর মাঝেমধ্যে কারও ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎ সে থেমে গেল। ফরমের কয়েকটি জায়গা যেন বুঝতে পারছিল না। একটু ইতস্তত করে পাশের দিকে তাকাল।

 

“একটু দেখবেন?”

 

তুফান মাথা তুলে তাকাল। মেয়েটা ফরমটা এগিয়ে দিল। তুফান কয়েক সেকেন্ড দেখল, তারপর বলল,

“এটা একটা ধাঁধার মতো—কালো রঙ দিয়ে ‘লাল’ শব্দ লেখা। এখানে ‘ঘ’ অপশনটিতে টিক দিন।”

 

এরপর আরও কয়েকটি প্রশ্নের সমাধান করার চেষ্টা করল তুফান। মেয়েটা হালকা হাসল।

“ও আচ্ছা, বুঝলাম।”

 

কিছুক্ষণ পর তুফান নিজেই একটি জায়গায় এসে থেমে গেল। ফরমটা একটু ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে ধরল।

“এটা কি জানেন?”

 

মেয়েটা ফরম দেখে বলল,

“এখানে আগের স্কুলের কোডটা লিখতে হয়।”

 

ফরম পূরণ শেষে কক্ষে শিক্ষকদের একজন এসে বললেন,

“যাঁরা শেষ করেছেন, তাঁরা দুজন করে এসে টেবিলে জমা দিয়ে যান।”

 

বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে জমা দিয়ে ফেলেছে। মেয়েটা তুফানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনারটা হয়ে গেছে?”

 

তুফান হালকা মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ, আপনারও তো মনে হয় হয়ে গেছে।”

 

মেয়েটা ফরমটা একটু তুলে দেখাল।

“হুম, আপনার জন্যই হলো বেশিরভাগ।”

 

তুফান হেসে বলল,

“না, আমারও একটা জায়গা আপনি না বললে ভুলই লিখতাম।”

 

দুজন একসাথে গিয়ে ফরম জমা দিল। কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় আবার দুজনের চোখাচোখি হলো।

 

মেয়েটা একটু হেসে বলল,

“আচ্ছা… আমি জাইনা।”

 

তুফান এক মুহূর্ত থেমে বলল,

“আমি তুফান।”

 

অদ্ভুতভাবে দুজনেরই মনে হলো—আজকের এই ছোট্ট পরিচয়টা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না।

 

তুফান কিছুক্ষণ প্রশাসনিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই তার কাছে একটু অপরিচিত লাগছিল। কয়েক মুহূর্ত পরে সে ধীরে ধীরে কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

 

কলেজের গেটের বাইরে বের হতেই শহরের ব্যস্ততা চোখে পড়ল। রিকশা চলছে, রাস্তার পাশে কয়েকটা ছোট দোকান, কিছু অভিভাবক এখনো তাদের সন্তানদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুফান একটু থেমে চারপাশটা দেখল। মনে হলো—এটাই এখন থেকে তার নতুন জায়গা, নতুন পথচলা।

 

কিছুক্ষণ পরে সে মেসে ফিরে গেল।

 

পরের কয়েকদিন কলেজে তেমন কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটল না। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, ক্লাসের রুটিন বোঝা—এসব নিয়েই সময় কাটতে লাগল।

 

একদিন ক্লাসে ঢুকে তুফান হঠাৎ খেয়াল করল, সামনে কয়েক সারি পরে একটি পরিচিত মুখ বসে আছে। ভর্তি দিনের সেই মেয়েটি—জাইনা।

 

তবে সেদিনও তাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। শুধু পরিচিত একটা মুখ দেখার মতোই মনে হলো।

 

কিন্তু কলেজে প্রতিদিন দেখা হতে হতে অচেনা মুখগুলোও ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠতে লাগল।

 

আর সেই পরিচিত হওয়ার ভিড়েই কোথাও তুফান আর জাইনার গল্পটাও নীরবে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল।

 

ক্লাসের প্রথম সপ্তাহগুলো কেটে যেতে লাগল। তুফান ও জাইনা মাঝে মাঝে ক্লাসের কাজ নিয়ে একে অপরের দিকে সাহায্য করত। কখনও তুফান কোনো সমস্যা বুঝিয়ে দিত, কখনও জাইনা তুফানকে বুঝাতো।

 

একদিন তুফান খেয়াল করল, জাইনা তার লেখা নোটগুলো কপি করছে। সে বলল,

“এইটা তো আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করছে।”

 

জাইনা একটু লাজুকভাবে হেসে বলল,

“তোমার লিখিত নোট ছাড়া তো আমি কিছুই বুঝতে পারতাম না।” মেয়েদের হাসি-কান্না বোঝাটাও জটিল।

 

এই হাসিগুলো, সেই হালকা চোখের দেখা—ছোট্ট মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্বকে গভীর করে তুলল।

ছয় মাসের মধ্যে ক্লাসের বাইরে তারা মাঝে মাঝে শহরের কফি শপ, লাইব্রেরি বা ছোট পার্কে দেখা করতে লাগল। তারা গল্প করত, বই নিয়ে আলাপ করত, ছোট ছোট সমস্যা সমাধান করত। কোনোটিই নাটকীয় বা বড় ঘটনা নয়।

 

তুফান প্রতিটি মুহূর্তে খেয়াল রাখত—জাইনা যেন খুশি থাকে, যেন তাকে কোনো সমস্যা না হয়। জাইনা ধীরে ধীরে বুঝতে লাগল, এই ছেলে শুধু বন্ধু নয়, হৃদয়ে তাকে বিশেষ স্থান দিয়েছে।

একদিন তারা কলেজের লম্বা চত্বরে হাঁটছিল। হঠাৎ তুফান থেমে দাঁড়িয়ে বলল,

“জাইনা, আমি চাই তুমি জানো—আমি সবসময় পাশে থাকব। কিছুই হতে দিলে তোমাকে একা দেখব না।”

 

জাইনা হেসে কিছুই বলল না। কিন্তু চোখে যেন আকাশের মতো প্রশান্তি ও বিশ্বাস ফুটে উঠল।

এভাবেই তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গড়ে উঠল— বিতর্ক ছাড়া তবে খুনসুটিতে। শুধু ছোট ছোট বোঝাপড়া, একে অপরকে সাহায্য, হাসি, চোখের দেখা—এগুলোই তাদের প্রেমকে মধুর করে তুলল।

 

ছয় মাস কেটে গেছে, অথচ মনেই হলো না। সবই যেন স্বপ্নের মতো।

 

ছয় মাসের পরের সাত মাসের প্রথম দিনে তুফান কলেজে উপস্থিত হতে পারলো না। এরপরের দিনগুলোতেও তাকে ক্লাসে দেখা গেল না। জাইনা ধীরে ধীরে কৌতূহল ও উদ্বেগ অনুভব করল। প্রতিদিন শ্রেণির ট্যালি খাতায় তার নামের পাশে লাল রঙ ভরছিল—শূন্য, অভাব।

 

জাইনা ভেবেছিল—হয়তো কোনো অসুস্থতা, কিন্তু এতদিন? সে সহপাঠীদের জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কেউ কিছু জানত না। ফোনে কল করল—ফোন বন্ধ। মেসেজ করল—কোনো রিপ্লাই নেই।

 

যাদের সাথে তুফান মেসে থাকতো, তাদেরই একজন পল্লব। অর্থাৎ তুফান যাকে মাঝেমাঝে তাদের কলেজে নিয়ে আসতো ঘুরতে, জাইনার সাথে পরিচয় করে দিয়েছিল, তার কাছ থেকেও কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। অবশ্য যাদের সাথে মেসে থাকতো তারা কেউ নবযাত্রা কলেজের ছাত্র না।

 

ধীরে ধীরে জাইনার মনে সন্দেহ জন্মালো—তুফান অন্য কারো সঙ্গে রিলেশনে জড়ায়নি তো? কিন্তু কলেজ আসছে না কেন?

 

দুই মাসের এই দীর্ঘ বিরতি শেষে, হঠাৎ একদিন তুফান আবার কলেজে উপস্থিত হলো।

 

পরীক্ষা শুরু হওয়ার জন্য আর কিছু দিন বাকি। কলেজে এসে সে কারো সাথে তেমন কথা বলল না।

 

দুইটা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তুফান জাইনার সাথে দেখা করতে চাইল, কিন্তু জাইনা মুখ ফিরিয়ে নিল। সে তার আচরণে বোঝাতে চাইল, সে দেখা করতে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ “আমায় তো দেখতেই পারছো, আর কি দেখবে?”

 

তিনটা পরীক্ষা দেওয়ার পর তার আচরণে সামান্য আগ্রহ দেখা গেল। তখন তুফান জাইনার কাছে গিয়ে বলল,

“আজ তোমার কাছে আমায় ক্ষমা চাইতে হয়। দু’মাস কলেজে আসতে পারিনি, তোমার সাথে কোনো কথা বলিনি। কেন বলিনি জানো? আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। তবু চেয়েছি, তুমি যেন আমার জন্য ছটফট না করো, আমাকে অপরাধী ভেবে ভুলে থেকে পড়াশোনায় মন দাও।

 

আমার কলেজে না আসায় হয়তো তোমার সামনে আমার মুখ কয়েকবার আয়নার মতো পড়েছিল। কথা বলিনি, কারণ আমি চাইনি নিয়মিত ভিডিও কলে আমার মানসিক অবস্থা তোমার ওপর চাপ দিক। আমাকেও খারাপ লাগছে তোমাকে সময় দিতে না পারায়। আবার হয়তো আমি অনিয়মিত হয়ে যাবো।

 

এতদিনে যদি তুমি আমার বিকল্প কাউকে বেছে নাও, তাহলে তোমার জন্য রইল শুভকামনা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমি চাইনি, তুমি আমার জন্য কষ্ট পাও—যেমনটা আমি করেছি।”

 

জাইনা কোনো উত্তর দিলো না। তুফান তখন জাইনার কাছে একটি নিজের লেখা ডায়রি দিল। অল্প লেখা থাকলেও লেখার গভীরতায় লুকানো ছিল তাদের প্রেমের কিছু স্মৃতি।

 

ভিতরে ভিতরে এখনো সে তুফানকে অনেক ভালোবাসে, কিন্তু দু’মাসের জমে থাকা অভিমান অব্যাহত। যা তুফান ভাঙেনি, তার চেষ্টাও করেনি। জাইনা ডায়রি গ্রহণ করলেও কখনো পড়েনি।

 

পরীক্ষা শেষে তুফান বাড়ি গেল। যাওয়ার সময় জাইনার মোবাইল নম্বরে মেসেজে জানাল, “আমি বাড়ি যাচ্ছি।” এতটুকুই।

 

নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এক মাস পর জাতীয় নির্বাচন। তুফানের বন্ধু মাইদুল ঐক্য পরিষদের রাজনীতি করে। তারা প্রায়ই আড্ডা দেয়, অনলাইন—অফলাইনে। তুফান রাজনীতি করে না, কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন মাইদুলের সাথে স্টল সাজাতে যায়। নির্বাচনে তাদের আসনে ঐক্য পরিষদের প্রার্থী বিজয় অর্জন করেও।

 

দু’দিন পর সারাদেশের ফলাফলে গণবাদী দল এগিয়ে আসে। ফলে গণবাদী দল সরকার গঠন করে, প্রধানমন্ত্রী হন তারিফ রহমান।

 

তুফান তারিফ রহমান সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, শুধু জানে তিনি একজন রাজনীতিবিদ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কন্টেন্ট আপলোড করেন।

 

নির্বাচনের চার-পাঁচ দিন পর তুফান জাইনার নম্বরে কল করলেও জাইনা রিসিভ করল না। কিছুদিন ক্লাস করার উদ্দেশ্যে তুফান আসে নওগাঁয়।

 

এসে সে দেখে জাইনা আগের তুলনায় বদলে গেছে। ভিআইপি ভিআইপি ভাব—যেন তার বাবা দেশের মস্ত বড় কোনো ব্যক্তি। অবশ্য প্রেম চলাকালীন তুফান কখনো জানতে চায়নি জাইনার বাবা কী কাজ করেন বা তাদের পরিচয় কেমন।

 

তুফান জাইনার পাশ দিয়ে হাঁটতে যাচ্ছিল। তখন জাইনা বলল,

“কেমন আছো?”

 

তুফান থেমে বলল,

“ভালো। তুমি কেমন আছো?”

 

“ভালো।”

 

এর বেশি আর কোনো কথা হলো না।

 

ক্লাসে তুফান লক্ষ্য করল—শিক্ষকরা জাইনাকে আগের তুলনায় একটু বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

 

একদিন এক শিক্ষক তুফানকে শিক্ষকক্ষে আসতে বললেন। তুফান সেখানে গিয়ে দেখল কয়েকজন শিক্ষক বসে আছেন।

 

যিনি ডেকেছিলেন তিনি বললেন,

“তোমার পড়ালেখার দরকার নেই নাকি? নিয়মিত ক্লাস করো না। কলেজের ফিও সময়মতো দাও না।”

 

পাশে বসে থাকা আরেকজন শিক্ষক বললেন,

“এখন থেকে নিয়মিত ক্লাস করবে। সময়মতো কলেজ ফি দেবে। এতদিন কোথায় ছিলে বলো তো?”

 

তুফান মাথা নিচু করে বলল,

“স্যার, আমরা গরীব মানুষ। বাবা যা ইনকাম করে, তা দিয়ে ভাইয়া আর আমাকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে সংসারের জন্য তেমন কিছু থাকে না। তাই এতদিন আসতে পারিনি।”

 

এই কথাগুলো কক্ষেই শেষ হয়ে যায়নি।

 

কক্ষে তখন এক কাজের বুয়া শিক্ষকদের জন্য নাস্তার প্লেট নিয়ে ঢুকেছিল। সে কথাগুলোর কিছু অংশ শুনে বাইরে গিয়ে তার পরিচিত একজন ছাত্র—লিমনকে বলল। লিমন পরে সেই কথাগুলো জাইনাকে জানাল।

 

সেদিনই জাইনা প্রথমবার জানল—তুফানের পরিবার গরীব।

 

তার মনে জমে থাকা অভিমান যেন নিমেষেই মেঘের মতো অনেকটা নরম হয়ে গেল। তবু সে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারল না।

 

সেদিন রাতে সে তুফানের দেওয়া ডায়েরিটা খুলে পড়ল।

 

এদিকে তুফানও কিছু বিষয় লক্ষ্য করছিল। প্রায় প্রতিদিনই কলেজের বাইরে দুই-একজন অচেনা লোক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখত সে। একদিন দেখল, জাইনা তাদের সাথেই একটি গাড়িতে করে চলে যাচ্ছে। গাড়ির ড্রাইভারটিকেও তার পরিচিত মনে হলো—কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনই তাকে দেখেছিল। কিন্তু তুফানের মনে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। ভর্তি হওয়ার দিন এবং তার পরের কয়েকদিন জাইনা যে দুই মেয়ের সাথে কলেজে এসেছিল, তাদেরকে এরপর আর কখনো কলেজে দেখা যায়নি।

 

তুফান অবাক হলো। আগে কলেজের বাইরে কেউ এমন ঘুরাঘুরি করত না। এই দুই-একজন লোককে কোনো না কোনো সময় দেখা যাচ্ছে, যারা কেউ কলেজটিতে চাকরি করে না।

 

 

মেসের ছেলেদের সাথে দিন দিন তুফানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল। তারা মাঝে মাঝে মজা করে বলত,

 

“বন্ধু, ভাবির সাথে আবার সম্পর্কটা কন্টিনিউ কর।”

 

তুফান হেসে বলত,

“আমাদের সম্পর্ক তো ঠিকই আছে।”

 

একদিন কলেজে ঢোকার সময় তুফান শুনতে পেল দুই শিক্ষক ফিসফিস করে কথা বলছেন।

 

একজন বললেন,

“আমাদের এখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়ে। এবার দেখছি প্রধানমন্ত্রীর মেয়েও পড়ে।”

 

আরেকজন বললেন,

“মেয়েটিকে সহ সব শিক্ষার্থী যদি ভালো রেজাল্ট না করে, তাহলে কিন্তু আমরা বিপদে পড়ব।”

 

এই কথাটা তুফানের কানে গিয়ে লাগল।

 

সেদিন ক্লাস শেষে তুফান মেসে ফিরে গোসল করে বসেছিল। পাশে বসেছিল পল্লব।

 

তুফান তাকে জিজ্ঞেস করল,

“আমি কিছুদিন ধরে দেখছি, জাইনাকে শিক্ষকরা একটু বেশি প্রাধান্য দেয়। প্রতিদিন দু’একজন লোক তাকে পাহারা দেয়। ব্যাপারটা কী?”

 

পল্লব বলল,

“কোন জাইনা?”

 

“তোমায় কলেজে যে মেয়েটার সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলাম।”

 

“ওহ সেই মেয়েটি। তুমি কিছুই জানো না?” অবাক।

 

“কি জানব?”

 

সে বলল,

“জাইনা তারিফ রহমানের মেয়ে। তোমার গার্লফ্রেন্ড জাইনার কথাই বলছি।”

 

“তুমি কি জানো আমি তিনমাস কিং জং উনের জামাইয়ের সাথে মেসে থেকেছিলাম?”

 

“সত্যি রে ভাই, তুমি বিশ্বাস করো বা না করো, সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি কদিন আগে রিলসে দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে বসেছিল একটি মেয়ে। আমি ঠিক তখন স্ক্রল করতে যাচ্ছিলাম, দেখলাম মেয়েটাকে চেনাচেনা মনে হচ্ছে। রাতে শোয়ার আগে মনে পড়ে গেল—এটাই সেই মেয়েটা।”

 

তুফান থমকে গেল।

 

“কি?”

 

“হুম।”

 

সে ফেসবুক ঘাটাঘাটি করে তুফানকে দেখালো।

 

তুফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“তাহলে আর নবযাত্রা কলেজে পড়ব না। এটা প্রভাবশালীদের কলেজ। আমাদের মতো মানুষের জন্য না।”

 

পরদিন কলেজে গিয়ে তুফান দেখল, আজ জাইনাকে প্রটোকল দেওয়ার জন্য একজন লোক এসেছে। আসার পর সে জাইনাকে রেখে কোথায় যেন চলে গেছে।

 

তবু সে জেদ করে জাইনাকে দেখেও না দেখার ভান করল। মনে হলো কত রাগ। জাইনা ডাকলেও সে সাড়া দিল না।

 

তুফান সরাসরি লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে পড়ল—সেই নিরিবিলি লাইব্রেরি, যেখানে খুব কম মানুষ যায়।

 

কিছুক্ষণ পর জাইনা সেখানে এসে দাঁড়াল।

 

“বুঝলাম না, তুমি এমন করছো কেন?”

 

তুফান ঠান্ডা গলায় বলার চেষ্টা করলো,

“তুমি যাও। এখানে কেন এসেছো? তোমার রক্ষীবাহিনী দেখে ফেলবে তো।”

 

জাইনা বলল,

“আমি তো আসতে নিষেধ করি। তবু বাবা তাদের পাঠিয়ে দেয়। আজ রাগ করে বলেছি—ওরা এলে আমি কলেজেই আসব না। অন্য শিক্ষার্থীরা কী ভাববে?”

 

তুফান বলল,

“ওহ আচ্ছা ম্যাম। সরি… আমি গরীব ঘরের ছেলে। জানতাম না তুমি কোন পরিবারের।”

 

জাইনা বিরক্ত হয়ে বলল,

“তুমি কি এসব ছাড়া আর কিছু বলতে পারো না?”

 

তুফান বলল,

“কি বলব? টাকার অভাবে দুই মাস কলেজে আসতে পারিনি। আর তুমি অভিমান করে বসে ছিলে।”

 

জাইনা শান্ত গলায় বলল,

“আমি জানতাম না। সত্যি জানতাম না। তুমি তো কখনো বলওনি। তোমার প্রতি এখন আর কোনো অভিমান নেই।”

 

তুফান বলল,

“যাক, জেনে গেছো। ভালো হয়েছে। তোমার জন্য শুভকামনা রইল।”

 

জাইনা বলল,

“এত শুভকামনা দিয়ে কী করব?”

 

তুফান বলল,

“আমার বন্ধুকে আমি শুভকামনা দেব না?”

 

জাইনা তুফানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভালোবাসো? তুমি কি শুধুই আমার বন্ধু?”

 

তুফান চুপ করে রইল।

 

জাইনা আবার বলল,

“আচ্ছা বলো তো, আমি তোমার কাছে কী?”

 

তুফান ধীরে বলল,

“প্রিয় একজন… যাকে কাছের মনে হয়। কিন্তু—”

 

জাইনা থামিয়ে দিল।

 

“কিন্তু কী? তুমি শুধু তোমারটাই বুঝলে… আমাকে বুঝলে না?”

 

লাইব্রেরির ঘটনার কয়েকদিন পর তুফান আবার আগের মতো ক্লাসে আসা–যাওয়া করতে লাগল। যদিও আগের মতো সহজভাবে সবকিছু আর লাগছিল না, তবু সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল।

 

একদিন দুপুরে ক্লাস শেষে তুফান কলেজের এক পাশে গাছতলায় দাঁড়িয়ে জাইনার সাথে কথা বলছিল। খুব গভীর কোনো কথা নয়—সাধারণ পড়ালেখা আর পরীক্ষার কথা।

 

ঠিক তখনই কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল মাইদুল। আসার আগে সে তুফানকে মেসেজ করেছিল, কিন্তু ক্লাসে থাকায় তুফান সেটা দেখতে পারেনি।

 

কলেজে ঢুকে চারপাশে তাকাল সে। এই সেই নবযাত্রা কলেজ—যেখানে পড়ার স্বপ্ন অনেকেই দেখে।

 

কিছুটা এগিয়ে এসে কলেজের কোণের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল শহিদ মিনারের পাশের গাছতলায় তুফান দাঁড়িয়ে আছে। আর তার সামনে এক মেয়ে।

 

মাইদুল একটু অবাক হলো। কারণ তুফান সাধারণত মেয়েদের সাথে তেমন কথা বলে না।

 

এদিকে কথার ফাঁকে জাইনার চোখে পড়ল—কিছুটা দূরে একজন ছেলে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

 

জাইনা ধীরে বলল,

“দেখো তো, ছেলেটা এখানে পড়ে নাকি?”

 

তুফান তাকিয়ে দেখল। প্রথমে চেনা চেনা লাগল। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই স্পষ্ট বুঝতে পারল—এ তো মাইদুল!

 

সে হাত তুলে ইশারা করে ডাকল,

“এই, এদিকে আয়!”

 

মাইদুল এগিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।

 

তুফান হেসে বলল,

“কী ব্যাপার! নওগাঁয় পা রেখেছে বড় মানুষ!”

 

মাইদুলও হাসল।

“একটা কাজে আসছিলাম। ভাবলাম যখন এসেছি, তোদের সাথে দেখা করেই যাই।”

 

তুফান বলল,

“পরিচয় হ। এ জাইনা—আমরা একসাথে পড়ালেখা করি।”

 

জাইনা ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম।”

 

মাইদুলও হাসি দিয়ে বলল,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

 

কয়েক মুহূর্ত তারা তিনজন দাঁড়িয়ে সাধারণ কিছু কথা বলল। মাইদুল জানতে চাইল কলেজের পড়ালেখা কেমন চলছে। তুফানও স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল।

 

তারা একসাথে প্রায় এক ঘণ্টা সময় কাটাল। কিন্তু আর দেরি করা যায় না। মাইদুলকে বেরোতে হবে—বাস ধরতে হবে বাড়ি যাওয়ার জন্য।

 

দুই বন্ধু কলেজ থেকে বের হলো। মাইদুল স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা ধরল। স্ট্যান্ডটা খুব দূরে নয়, প্রায় আধা কিলোমিটার মতো। তুফান মেসের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

 

বিকেল নামা শুরু করেছে। রাস্তার পাশে দোকানপাট খোলা, মানুষজন আসা-যাওয়া করছে, গাড়ি-রিকশার চলাচল স্বাভাবিক। চারপাশে দিনের মতোই ব্যস্ততা, শুধু আলোটা একটু নরম হয়ে এসেছে।

 

ঠিক চার–পাঁচ মিনিট হাঁটার পর হঠাৎ তুফানের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মাইদুলের নাম।

 

তুফান থেমে ফোন ধরল।

 

ওপাশ থেকে কণ্ঠটা একেবারে অন্যরকম—তাড়াহুড়ো, চাপা ভয় আর অস্থিরতা মিশে আছে।

“তুফান… শোন, একটা সমস্যা হয়েছে।”

 

তুফান এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

“কী হয়েছে?”

 

মাইদুল দ্রুত বলল,

“স্ট্যান্ডে পৌঁছাতে পারিনি… কাছাকাছি, চেকপোস্টের কাছে আসতেই পুলিশ আমাকে থামিয়েছে। ব্যাগ চেক করে বলছে ইয়াবা পেয়েছে। কিন্তু আমি এসব রাখিনি। তুই তো জানিস, আমি এসব ছুঁইও না। আমি সত্যি বলছি, ওগুলো আমার না।”

 

কথাগুলো বলার সময় তার শ্বাস ভারী শোনা যাচ্ছিল।

 

তুফান চারপাশে একবার তাকাল। তারপর ধীরে বলল,

“তুই এখন কোথায়?”

 

“মনে হয় থানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে…”

 

কথাটা শেষ হতেই লাইনটা কেটে গেল।

 

তুফান আবার কল করার চেষ্টা করল। একবার… দুইবার… তিনবার… কিন্তু আর রিসিভ হলো না।

 

তার মুখে একটা চাপা উদ্বেগ জমে উঠল। সে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আর দেরি না করে পল্লবকে ফোন দিল।

 

সংক্ষেপে বলল,

“আমার গ্রামের বন্ধু মাইদুলকে পুলিশ ধরেছে। তুমি বের হও, থানার দিকে যেতে হবে।”

 

পল্লব অন্য পাশে এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

“আচ্ছা, আমি আসছি।”

 

ফোন রেখে তুফান রাস্তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর পল্লব এলো। তারা একটা রিকশা ডাকল।

 

রিকশায় উঠে সে বলল,

“থানার দিকে যাবেন।”

 

রিকশা চলতে শুরু করল।

 

তুফান সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—মাইদুল ঠিক আছে তো? সামনে কী অপেক্ষা করছে?

 

রিকশা থানার কাছাকাছি এসে থামল। সামনে লোহার বড় গেট, পাশে অস্ত্রধারী সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে। ভেতরে থানা ভবন দেখা যাচ্ছে—নিচতলায় আলো জ্বলছে, মানুষের আসা–যাওয়া চলছে।

 

তুফান আর পল্লব নেমে গেটের দিকে এগোল। সেন্ট্রি তাদের থামাল।

“কোথায় যাবেন?”

 

তুফান বলল,

“একজনকে একটু আগে ধরে এনেছে। তার সাথে দেখা করতে এসেছি।”

 

সেন্ট্রি একবার তাদের দেখে ভেতরে যেতে ইশারা করল।

 

তারা গেট পার হয়ে থানার ভেতরের প্রাঙ্গণে ঢুকল। সামনে থানা ভবন। ভেতরে ঢুকতেই একধরনের চাপা পরিবেশ—কেউ জিডি করছে, কেউ নিচু স্বরে কথা বলছে, টেবিলের ওপর ফাইল ছড়ানো।

 

নিচতলার সামনের দিকেই ডিউটি অফিসারের ডেস্ক। একপাশে কাঠের কাউন্টার, ওপাশে একজন অফিসার বসে আছেন। পাশে কনস্টেবল দাঁড়িয়ে। একটু দূরে করিডরের দিকে লোহার গ্রিল—সেখানে আসামিদের রাখা হয়।

 

তুফান আর পল্লব ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

 

তুফান বলল,

“স্যার, একটু আগে স্ট্যান্ডের কাছ থেকে একজনকে ধরে আনা হয়েছে। আমরা তার পরিচিত… দেখা করতে চাই।”

 

ডিউটি অফিসার চোখ তুলে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে পাশে থাকা কনস্টেবলকে বললেন,

“নিয়ে যান। একজনকে দেখিয়ে আনেন।”

 

কনস্টেবল এগিয়ে এসে বলল,

“আসেন।”

 

তুফান পল্লবের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“তুমি যাও। সবটা জেনে নাও… আমি এখানে কথা বলি—কোন মামলায় ধরছে আর কী করা যায়।”

 

পল্লব মাথা নেড়ে কনস্টেবলের সাথে করিডরের দিকে এগিয়ে গেল।

 

এদিকে তুফান ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে আবার বলল,

“স্যার, তার ব্যাপারটা একটু জানতে চাচ্ছিলাম…”

 

ডিউটি অফিসার ফাইল উল্টাতে উল্টাতে বললেন,

“কেস হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানা যাবে।”

 

তুফান এবার একটু থেমে আবার বলল,

“কোন ধরনের কেস, স্যার?”

 

অফিসার চোখ তুলে তাকালেন।

“আপনার সাথের ব্যক্তি শুনে আসুক। তারপর কথা বলেন।”

 

তুফান আর কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

 

কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট প্রতিজ্ঞা—এই জায়গা থেকে সে খালি হাতে ফিরবে না।

 

পল্লব কনস্টেবলের সাথে করিডর ধরে এগিয়ে লোহার গ্রিলের কাছে পৌঁছাল। ভেতরে মাইদুল বসে আছে। চারপাশে আরও কয়েকজন আসামি, সবাই নীরব।

 

কনস্টেবল ইশারা করে বলল,

“ওই যে, কথা বলেন।”

 

পল্লব গ্রিলের সামনে দাঁড়াল। মাইদুল তাকে দেখে সামান্য সামনে এগিয়ে এল।

 

পল্লব নিচু স্বরে বলল,

“সব ঠিক আছে? পুরো ঘটনাটা বলুন। কীভাবে আপনাকে গ্রেফতার করা হলো? আমি তুফানের সাথে এসেছি।”

 

মাইদুল একটু গুছিয়ে নিয়ে কথা শুরু করল,

“আমি যখন চেকপোস্টের কাছে পৌঁছাই, তখন পুলিশ আমাকে থামায়। আমি স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়াই। হঠাৎ একজন আমার ব্যাগটা হাতে নেয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, ‘কি ব্যাপার, ব্যাগ নিচ্ছেন কেন?’

 

ওদের একজন বলে, ‘দাঁড়ান, ধৈর্য হারাবেন না।’

 

এরপর ব্যাগ খুলে দেখে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রথমজন কিছু না পেয়ে ব্যাগটা আরেকজনের হাতে দেয়। সে আবার ভালোভাবে চেক করে।

 

তারপর তারা তিনজন একসাথে ব্যাগটা ঘিরে ধরে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বলে, ব্যাগে নাকি ইয়াবা পাওয়া গেছে।

 

কিন্তু আমার ব্যাগে আমি নিজে যা রেখেছিলাম, সেটাই ছিল, আর কিছু না। আমি নিশ্চিত, ওই সময়ের মধ্যেই কিছু একটা ঘটেছে। ব্যাগটা কিছুক্ষণ তাদের হাতেই ছিল, আমার চোখের আড়ালে।”

 

পল্লব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

“সেখানে আর কেউ ছিল? কোনো সাক্ষী?”

 

মাইদুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“পরে দুজন লোককে দাঁড় করানো হয়, যাদের আমি আগে দেখিনি।”

 

পল্লব ধীরে মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা বিষয়টা দেখছি।”

 

এদিকে তুফান ডিউটি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শান্তভাবে চারপাশ দেখছে আর চিন্তা করছে।

 

কিছুক্ষণ পর পল্লব করিডর থেকে ফিরে তুফানের পাশে এসে দাঁড়াল। নিচু স্বরে বলল,

“ব্যাগটা চেক করার সময় তাদের হাতেই ছিল। আর যাদের সাক্ষী বলা হচ্ছে, তারা তখন সেখানে ছিল না বলেই মাইদুল বলছে।”

 

তুফান ধীরে মাথা নাড়ল।

তার চোখে সন্দেহটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, কেননা পুলিশকে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

 

তুফান বলল,

“চলো বাইরে যাই। আইনজীবী ঠিক করতে হবে।”

 

পল্লব মাথা নেড়ে বলল,

“হুম। আমার পরিচিত এক মামা আছেন, মিজানুর রহমান মিলন। তিনি আইনজীবী। চলো তার কাছে যাই।”

 

দু’জন থানা থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াল। পল্লব ফোন বের করে মিলনকে কল করল।

 

“মামা, আপনি বাসায় আছেন? একটা জরুরি কাজ আছে… আমাদের এক বন্ধুকে জামিন করাতে হবে।”

 

ওপাশ থেকে মিলনের কণ্ঠ শোনা গেল,

“হ্যাঁ, আছি। চলে আসো। এখন ফ্রি আছি।”

 

কল শেষ করে পল্লব তুফানের দিকে তাকাল।

“চলো, উনার কাছে যাই।”

 

দু’জন একটি রিকশা নিয়ে রওনা দিল।

 

রিকশা কিছুক্ষণ চলার পর একটি সাধারণ বাসার সামনে এসে থামল। পল্লব সামনে এগিয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে সাড়া এল।

 

দরজা খুলতেই মিলন বেরিয়ে এলেন।

“এসো, ভিতরে এসো।”

 

তারা ভেতরে ঢুকল। বসার ঘরে বসে মিলন বললেন,

“বল, কী হয়েছে পুরোটা।”

 

পল্লব সংক্ষেপে শুরু করল—মাইদুলের গ্রেফতার, চেকপোস্ট, ব্যাগ চেক, ইয়াবা পাওয়া, আর সাক্ষীর বিষয়টা। তুফান মাঝে মাঝে কিছু বিষয় স্পষ্ট করে যোগ করল।

 

সব শুনে মিলন কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর ধীরে বললেন,

“ঠিক আছে, বিষয়টা সিরিয়াস। তবে এটা হ্যান্ডেল করা সম্ভব।”

 

তিনি সামনে একটু ঝুঁকে বললেন,

“প্রথমে আমাদের গ্রেফতারের প্রসেসটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। এরপর জামিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাক্ষ্য এবং চেকিংয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি বা গ্যাপ আছে কি না।”

 

পল্লব বলল,

“মামা, এখনই কি কিছু করা যাবে?”

 

মিলন শান্তভাবে বললেন,

“আজকে আমি প্রয়োজনীয় ড্রাফট প্রস্তুত করব। কাল সকালে থানায় বা কোর্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেব।”

 

তুফান দৃঢ়ভাবে বলল,

“স্যার, আমরা যা করার দরকার সব করব।”

 

মিলন মাথা নেড়ে বললেন,

“ভালো। তোমরা চিন্তা করো না। আমরা নিয়ম মেনেই এগোবো।”

 

ঘরের ভেতরে এক ধরনের শান্ত কিন্তু প্রস্তুত পরিবেশ তৈরি হলো। সামনে আইনি লড়াই শুরু হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠল।

 

মিলন কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,

“ঠিক আছে, আজ রাতেই আমরা পুরো কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলি। কাল সকালে আমি নিজে থানায় যোগাযোগ করব।”

 

পল্লব বলল,

“মামা, থানা থেকেই কি কোনোভাবে দ্রুত রিলিজ পাওয়া যাবে?”

 

মিলন মাথা নেড়ে বললেন,

“সরাসরি না। কিন্তু আমরা যদি দেখাতে পারি যে গ্রেফতার প্রক্রিয়ায় গ্যাপ আছে এবং ব্যাগ হ্যান্ডলিংয়ে অনিয়ম হয়েছে, তাহলে পুলিশ নিজেই বিষয়টা রিভিউ করতে পারে।”

 

তিনি একটু থেমে যোগ করলেন,

“আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে সমন্বয় করা। ওনার রিপোর্টের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।”

 

তুফান বলল,

“তাহলে কালই কি আমরা থানায় যাব?”

 

মিলন বললেন,

“হ্যাঁ। আমি যাব তোমাদের সাথে। ওসি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলব। প্রয়োজনে লিখিত আবেদনও দেব।”

 

পরের দিন সকাল।

 

তিনজনই থানার সামনে এসে দাঁড়াল। মিলন এগিয়ে গিয়ে ডিউটি অফিসারের কাছে নিজের পরিচয় দিলেন। তারপর সরাসরি তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা করার অনুরোধ করলেন।

 

কিছুক্ষণ পর তাদের ভেতরে যেতে দেওয়া হলো।

 

মিলন আত্মবিশ্বাসের সাথে পুরো বিষয়টা তুলে ধরলেন—

গ্রেফতারের সময় ব্যাগের হেফাজত, চেকিংয়ের সময় একাধিক হস্তান্তর, এবং নিরপেক্ষ সাক্ষীর অনুপস্থিতি।

 

কথা শেষ হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফাইলগুলো দেখে বললেন,

“আমরা বিষয়টা রিভিউ করব। রিপোর্ট যাচাই করে দেখা হবে।”

 

মিলন শান্তভাবে বললেন,

“আমরা চাই বিষয়টা ন্যায্যভাবে বিবেচনা হোক। এখানে আমার ক্লায়েন্ট নির্দোষ বলে দাবি করছি, এবং সেই ভিত্তিতেই আমরা জামিনের আবেদন করছি।”

 

কিছুক্ষণ আলোচনার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্মত হলেন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে।

 

এরপর মিলন কোর্টে জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি প্রমাণ, পরিস্থিতি এবং গ্রেফতারের প্রক্রিয়ার অসংগতি তুলে ধরেন।

 

অল্প সময়ের শুনানির পর আদালত মাইদুলের জামিন মঞ্জুর করে।

 

কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে তুফান, পল্লব এবং মিলন একসাথে দাঁড়ায়।

 

পল্লব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল।”

 

মিলন হালকা হাসলেন,

“আইনের পথ ঠিকভাবে চললে এমন অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।”

 

তুফান কিছুটা শান্ত গলায় বলল,

“মাইদুল এখন নিরাপদে বের হতে পারবে।”

 

দূরে আদালতের সিঁড়ি ধরে মানুষজন উঠানামা করছে। আর তাদের এই ছোট্ট লড়াইটা আপাতত একটা সফল সমাপ্তির দিকে এগিয়ে গেল।

 

বিকালে কোর্ট থেকে বের হয়ে মিলন কিছুটা ব্যস্তভাবেই বিদায় নিলেন।

“আমি এখন অন্য কাজে যাচ্ছি। তোমরা সামলাও,”—এই বলে তিনি আলাদা হয়ে গেলেন।

 

পল্লব আর তুফান মাইদুলকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাছের বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগোল।

 

স্ট্যান্ডে পৌঁছে তারা মাইদুলের জন্য একটি বাস ঠিক করল। বাসে ওঠার আগে মাইদুল পল্লব আর তুফানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আজকের জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ আমি।”

 

পল্লব হালকা হেসে বলল,

“যান, সাবধানে থাকবেন।”

 

মাইদুল বাসে উঠে ভেতরে চলে গেল। বাস ধীরে চলতে শুরু করল।

 

মাইদুলকে বিদায় দিয়ে তুফান আর পল্লব আবার একটি রিকশা নিল মেসের উদ্দেশ্যে।

 

রিকশা এগিয়ে চলেছে। চারপাশে নরম হাওয়া, সন্ধ্যার আভা। দু’জনই কিছুটা চুপচাপ বসে আছে।

 

হঠাৎ পল্লব নিজের পকেটে হাত দিয়ে অনুভব করল একটি ফোন।

 

সে একটু ভ্রু কুঁচকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করে দেখল—ওয়ালপেপারে মাইদুলের ছবি। এটা মাইদুলের ফোন।

 

পল্লব অবাক হয়ে তুফানের দিকে তাকাল।

“ওর ফোনটা আমার কাছে চলে এসেছে।”

 

তুফান বলল,

“ওহ আচ্ছা।”

 

পল্লব ফোনটা খুলে কিছুক্ষণ গ্যালারি স্ক্রল করতেই একটি ছবিতে এসে থেমে গেল।

 

তুফান বলল,

“ফোন লক করো। ওর ব্যক্তিগত কিছু থাকতে পারে।”

 

পল্লব কিছুক্ষণ চুপ করে ছবিটা দেখল। তারপর ধীরে ফোনটা লক করে পকেটে রেখে দিল।

 

তার দৃষ্টি সামনের দিকে থাকলেও, মাথার ভেতরে একটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে একটু পরে তুফানের দিকে তাকাল।

“একটা বিষয় জানতে চাই।”

 

তুফান হালকা স্বরে বলল,

“বলো।”

 

পল্লব একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি রাজনীতি করো?”

 

“না।”

 

“ওহ। মাইদুলের ফোনে দেখলাম তোমরা একটা স্টল সাজাচ্ছিলে। ব্যানার ঝুলানো, টেবিল ঠিক করা।”

 

তুফান বলল,

“ওটা… আমি এমনিতেই গিয়েছিলাম। মাইদুল রাজনীতি করে, ওর সাথেই গিয়েছিলাম।”

 

তারপর একটু থেকে বলল,

“আচ্ছা, এটা কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিই। ওর ফোন তো ওর কাছেই থাকা উচিত।”

 

পল্লব রিকশা ওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল,

“মামা, এখানে কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসটা কোথায়?”

 

রিকশা ওয়ালা সামনে ইশারা করে বলল,

“একটু সামনেই আছে। আমি দাঁড়াবো নে, আপনি দিয়ে আইসেন।”

 

পল্লব বলল,

“আচ্ছা।”

 

কিছুক্ষণ পর তারা কাছের একটি কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে গেল। ফরম পূরণ করে মাইদুলের ফোনটি কুরিয়ারের জন্য জমা দিল।

 

ফোনটি কুরিয়ারে দিয়ে তারা আবার রিকশায় উঠে বসল।

 

মেসের সামনে এসে ভাড়া মিটিয়ে তারা নেমে পড়ল।

 

পল্লব বলল,

“চল, খেয়ে আসি।”

 

তুফান কোনো কথা না বলে, তারা চুপচাপ মেসের পাশের ছোট হোটেলে গিয়ে খেতে বসল। প্লেটে খাবার, চামচের ঠোকাঠুকি, প্লেটের শব্দ, আর চারপাশের মানুষের হালকা কথাবার্তা—সব মিলিয়ে একটা নিঃশব্দ পরিবেশ, যদিও কথা শব্দের মধ্যেই পড়ে।

 

খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে তারা মেসে ফিরে তাদের রুমে ঢুকল। ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল, সাথে থাকা আরেকজন আগেই শুয়ে আছে।

 

পল্লব বিছানায় গা এলিয়ে বলল,

“আমি আর পারতেছি না… ঘুমাই।”

 

তুফান কিছু বলল না। দুই-এক মিনিট চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে থাকার পর ধীরে শুয়ে পড়ল।

 

কিছুক্ষণ পরই পল্লব গভীর ঘুমে নিমজ্জিত।

 

ঘরের মধ্যে নেমে এল নিঃশব্দতা। শুধু ফ্যানের হালকা বাতাস আর দূরের ঘড়ির টিকটিক। তুফানের চোখে ঘুম নেই। সে চুপচাপ শুয়ে আছে, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—জাইনা, পরিবার, আর পড়ালেখা… সব কিছু।

 

সে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল, কিন্তু ঘুম ধরছিল না। মনে মনে ভাবছিল—জাইনাকে একটা মেসেজ দেই কি, নাহ, এখন দিলে হয়তো রিপ্লাই পাওয়া যাবে না।

 

নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিল, “এই দেশে কেউ একবার সরকার হলে বারবার হওয়ার মতোই।” গত আমলগুলো, যেসব ঘটনা দেখা গেছে—সবই এটার ইঙ্গিত দেয়।

 

প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের সাথে প্রেম… যদি কেউ নজরদারি করে, তাহলে বাঁচতে পারব কি না। তার ভাইও শহরে অযথা বসে আছে। দেশে সঠিক কর্মের অভাব, আর নিজের হাতে কিছু নেই—সব মিলিয়ে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

 

সব ভাবনা আর অস্থিরতার মাঝে ধীরে ধীরে তার শরীর ভারি হয়ে এল। চোখের পাতা বন্ধ হলেও, মনটা কিছুটা শান্তির দিকে ঝুঁকলো। ধীরে ধীরে ঘুম এসে পড়ল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd