নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বললেই অধিকাংশ মানুষ প্রথমেই মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, এই উপাধির প্রথম ব্যবহার ছিল মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর নামে। তিনি ছিলেন ধর্মপ্রচারক, সমাজ সংস্কারক ও লেখক।
প্রথমবার “বঙ্গবন্ধু” হিসেবে মুন্সী মেহেরুল্লাহর উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৯১ সালে, লেখক মির্জা ইউসুফ আলীর বই দুগ্ধ-সরোবর-এর ভূমিকায়। পরে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার এক ছাত্রজোটের সভায় নেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে এই খেতাব দেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ড. মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মেহেরুল্লাহ সমাজ ও মানুষের কল্যাণে যেসব উদ্যোগ নেন, তা তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” খেতাবের যোগ্য করে তোলে। তাঁর গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, সমাজসেবার মাধ্যমে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি প্রথম হিসেবে এই খেতাব পান।
মুন্সী মেহেরুল্লাহ ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর যশোর জেলার ঘোপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হলেও তিনি আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। দর্জির কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি ধর্মীয় চিন্তাচেতনায় সক্রিয় ছিলেন।
প্রথমে খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব পড়লেও পরে ইসলামে ফিরে আসেন এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের বিরুদ্ধে ধর্মসভা ও লেখনী প্রকাশের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা অঞ্চলে ধর্মসভা বা ওয়াজ মাহফিলের প্রচলন শুরু করাতেও মেহেরুল্লাহর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
মেহেরুল্লাহর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে খৃষ্টীয় ধর্মের অসারতা (১৮৮৬), মেহেরুল ইসলাম (১৮৯০), খৃষ্টান-মুসলমান তর্ক-যুদ্ধ, হিন্দুধর্ম রহস্য (১৮৯৬), দলিলোল ইসলাম (১৯০৯) এবং নবরত্নমালা বা বাংলা গজল (১৯১১)।
তাঁর নাম আজও যশোরে সংরক্ষিত রয়েছে—‘মুনশী মেহেরুল্লাহ ময়দান’, একটি রাস্তা, রেলস্টেশন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মুন্সী মেহেরুল্লাহ অ্যাকাডেমি’-র মাধ্যমে। এছাড়া যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের নামেও তিনি স্মরণীয়।
মুন্সী মেহেরুল্লাহ ১৯০৭ সালের ৮ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন ফররুখ আহমদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আল মাহমুদ, আনিসুজ্জামান, শাহেদ আলী এবং আরও অনেকে।
নাসির হেলাল সম্পাদিত এক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, মেহেরুল্লাহর নামের বানান বিভিন্ন স্থানে ভিন্নভাবে পাওয়া গেলেও তাঁর স্বাক্ষরে সর্বদা “মহম্মদ মেহেরুল্লাহ” লেখা ছিল।