
আব্দুল কাদের
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আবারও আমাদের দুয়ারে উপস্থিত ইংরেজি নববর্ষ। জীর্ণ পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার এই বৈশ্বিক আবহে বাংলাদেশও মেতে ওঠে এক অস্থির উল্লাসে। কিন্তু থার্টিফার্স্ট নাইটের মধ্যরাতে যখন কান ফাটানো পটকা আর আতশবাজির শব্দে আকাশ প্রকম্পিত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—এই যে উদযাপন, এটি কি আমাদের সংস্কৃতির অংশ? নাকি আমরা উৎসবের নামে এক যান্ত্রিক উন্মাদনায় নিমজ্জিত হচ্ছি?
অতীতের সেই প্রাণের মেলা
বাঙালি ঐতিহাসিকভাবেই উৎসবপ্রিয়।
তবে আমাদের উৎসবের মূলে ছিল মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক সংযোগ। গ্রামীণ জনপদে নবান্ন কিংবা নববর্ষ পালন হতো প্রকৃতির সাথে মিতালি করে। সেখানে সানাইয়ের সুর ছিল, মাটির মানুষের গান ছিল, ছিল ঘরে তৈরি পিঠা-পায়েসের সুগন্ধ। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে উৎসব মানে ছিল বিনয়। বড়দের দোয়া নেওয়া, ছোটদের স্নেহ করা এবং পাড়া-প্রতিবেশী মিলে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। সেখানে আড়ম্বর ছিল কম, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন ছিল অনেক বেশি।
শব্দের নিষ্ঠুরতা ও বর্তমান সংকট
বিগত কয়েক বছরে ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ পালনের ধরন আমূল বদলে গেছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছোঁয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় পটকা ও আতশবাজির বিরামহীন তান্ডব। আমরা কি একবারও ভেবে দেখি, এই প্রচণ্ড শব্দে আমাদের ঘরের বৃদ্ধ মানুষটি কতটা আতঙ্কিত হন? কিংবা হাসপাতালের নিভৃত কক্ষে শুয়ে থাকা মুমূর্ষু রোগীটির হৃদস্পন্দন কতটা অনিয়মিত হয়ে পড়ে? যে উৎসবে অন্যের চোখের জল ঝরে, তাকে কি আদৌ ‘উৎসব’ বলা চলে?
আমাদের করণীয়
নতুন বছরকে বরণ করতে হবে মানবিকতা দিয়ে। শব্দদূষণ বন্ধ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজস্ব সংস্কৃতির মার্জিত রূপ বজায় রাখাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আলোর খেলায় আকাশকে রাঙানোর চেয়ে ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করাই হোক আমাদের নতুন বছরের শপথ।
