নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পেশার মতো সাংবাদিকতাতেও এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে দ্রুতগতিতে। তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংবাদ বিশ্লেষণ, শিরোনাম নির্ধারণ এমনকি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরিতেও এআই এখন বড় ভূমিকা পালন করছে। তবে এই প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য অবারিত সুযোগ যেমন আনছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্ন।
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে এআইয়ের পদযাত্রা
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স, ফোর্বস এবং নিউইয়র্ক টাইমসের মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেছে। তথ্য বিশ্লেষণ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ—যেমন খেলাধুলার ফলাফল বা শেয়ার বাজারের সংবাদ তৈরিতে এআই মানুষের শ্রম ও সময় কমিয়ে দিচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ সাধারণ খবর এআই বট ব্যবহার করেই তৈরি হতে পারে।
নিউজরুমে গতি এবং কনটেন্ট পার্সোনালাইজেশন
বাংলাদেশেও অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রতিযোগিতার এই যুগে দ্রুত সংবাদ পরিবেশনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে এআই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। এআই-চালিত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে পাঠকদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী সংবাদ পৌঁছে দেওয়া (পার্সোনালাইজেশন) এখন অনেক সহজ। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় ফ্যাক্ট-চেকিং টুল ব্যবহার করে ভুয়া খবর শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে গতিশীল হয়েছে।
চাকরি হারানো এবং নৈতিক সংকট
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। এআই ব্যবহারের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইতিমধ্যে কিছু সংবাদকর্মী এআই ব্যবহারের কারণে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং অর্ধেকেরও বেশি সাংবাদিক ভবিষ্যতে এই আশঙ্কায় ভুগছেন। এছাড়া এআই-এর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং ভুল তথ্যের ঝুঁকিও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। ভুল নির্দেশনার কারণে এআই বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করতে পারে, যা পোর্টালের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
সৃজনশীলতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই হয়তো তথ্য সাজাতে পারে বা দ্রুত লিখতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো অনুসন্ধানী মনোভাব, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সংবেদনশীলতা এর নেই। সৃজনশীল কাজ বা গভীর কোনো মানবিক আবেদন রয়েছে এমন প্রতিবেদন তৈরিতে এখনো মানুষের কোনো বিকল্প নেই। তাই এআই-কে সাংবাদিকের প্রতিযোগী না ভেবে সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভবিষ্যৎ পথচলা ও নীতিমালা
দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে নিউজরুমে এআইয়ের ব্যবহার শুরু করেছে। তবে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা থাকা জরুরি। সাংবাদিকদের জন্য এআই লিটারেসি বা ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই একজন নিষ্ঠাবান সংবাদকর্মীর বিকল্প হতে পারবে না; বরং একে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকতার গুণগত মান এবং গতি বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।