
কলমে: নীরব স্বর
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত কেবল উন্নয়নের চটকদার স্লোগানই শোনেনি, বরং এর আড়ালে দেখেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এক ভয়াবহ উৎসব। সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে যে তথ্যগুলো উঠে এসেছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিকের জন্য উদ্বেগের কারণ। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই স্পর্শকাতর খাতটিকে যেভাবে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে জিম্মি করা হয়েছে, তাকে নিছক ‘অনিয়ম’ বললে ভুল হবে; এটি ছিল পরিকল্পিত আর্থিক বিপর্যয়।
আদানির ফাঁদ ও জাতীয় ক্ষতি
এই লুটপাটের সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি করা হয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আদানির বিদ্যুতের দাম ভারতের সাধারণ গ্রিডের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, কেবল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাবদই আদানিকে অতিরিক্ত ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। গোড্ডায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা এনে যে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মডেল তৈরি করা হয়েছে, তার পুরো বোঝা আজ সাধারণ জনগণের কাঁধে। কমিটির ভাষ্যমতে, এমন আত্মঘাতী চুক্তির নজির বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই।
সিন্ডিকেটের কবলে সার্বভৌমত্ব
লুটপাটের এই জাল কেবল নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আহমেদ কায়কাউসসহ উচ্চপদস্থ ১১ জন কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি চুক্তির নেপথ্যে ৪ মিলিয়ন ডলারের গোপন লেনদেনেরও প্রমাণ মিলেছে। তথাকথিত ‘বিশেষ বিধান আইনের’ দোহাই দিয়ে প্রতিযোগিতাহীন চুক্তির মাধ্যমে সামিট, এসএস পাওয়ার এবং রিলায়েন্সের মতো গ্রুপগুলোকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন পিডিবির বার্ষিক লোকসান ৫ হাজার কোটি থেকে বেড়ে ৪৫ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে, অন্যদিকে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।
অব্যবহৃত সক্ষমতা ও গলার কাঁটা
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও এর একটি বড় অংশ (প্রায় ৯,৫০০ মেগাওয়াট) আজ অব্যবহৃত। কিন্তু চুক্তির মারপ্যাঁচে কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার ‘পেনাল্টি’ বা দণ্ড দিচ্ছে সরকার। জ্বালানি সংকট আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, অথচ সাধারণ মানুষের পকেট কেটে এই অর্থ তুলে দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির হাতে।
উত্তরণের পথ এবং আমাদের করণীয়
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হবে:
১. দুর্নীতির প্রমাণ মেলা মাত্রই এসব ঘাতক চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
২. বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. স্বাধীন জ্বালানি তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এই অভিশপ্ত চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুব মসৃণ নয়। আদানির মতো বড় সরবরাহকারীকে চ্যালেঞ্জ করলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি বা লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মুক্তির স্বার্থে আমাদের এই সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল কারিগরি নয়, এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই লুটপাটের বোঝা থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই সংস্কারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি।
