
সাবিত রিজওয়ান
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই আপ্তবাক্যটি আমাদের পাঠ্যবইয়ে যতোটা উজ্জ্বল, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ততোটাই ম্লান। বিশেষ করে যখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে একজন শিক্ষার্থীকে কেবল তার জিপিএ-র কারণে নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্যুত হতে হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—শিক্ষা কি তবে সুযোগের সমতা নাকি কেবল ফলাফলের পুরস্কার?
পায়রাবন্দ অঞ্চলে দুটি মানসম্মত কলেজ থাকা সত্ত্বেও পাশের গ্রামগুলোর (শালমারা, ঠাকুরবাড়ি, বিরাহিমপুর) শিক্ষার্থীরা আজ এক অদ্ভুত সংকটে। প্রথমত, ভর্তির ক্ষেত্রে জিপিএ-ভিত্তিক কঠোর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকার সরকারি কলেজে জায়গা পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বিকল্প হিসেবে যে দূরবর্তী কলেজগুলোতে তাদের যেতে হচ্ছে, সেখানে যাতায়াত খরচ মেটানো অধিকাংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধ্যের বাইরে। প্রতিদিন ৮০-১০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া মানে মাসে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। যে বাবা দিনমজুরি করেন বা ছোট কৃষক, তার কাছে এই অঙ্কটি একটি বিশাল বোঝা।
আমরা কি তবে উন্নয়নের মানচিত্র থেকে বাদ পড়েছি?
পায়রাবন্দের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো যেমন—শালমারা বা বৈরাগীগঞ্জ—সেখানে একটিও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। অথচ এসব এলাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। একটি এমপিওভুক্ত বা অন্তত আধা-সরকারি কলেজ স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। জায়গীর হাইস্কুল যদি ‘স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ হতে পারে, তবে শালমারা হাইস্কুল কেন নয়? ভৌগোলিক এই বৈষম্য দূর করা না গেলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার (Dropout rate) কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হবে না।
দারিদ্র্য কি তবে মেধার প্রতিবন্ধক?
আমরা যারা সাধারণ জিপিএ নিয়ে পাস করি, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। কিন্তু এই জিপিএ-র পেছনের গল্পটা কেউ দেখে না। যে ছেলেটি প্রাইভেট পড়ার টাকা জোগাড় করতে পারে না কিংবা যার ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার ৩.৩৩ পাওয়াটা কি জিপিএ ৫ পাওয়ার চেয়েও বড় সার্থকতা নয়? মলিন পোশাকে ক্লাসের কোণায় বসে থাকা ছেলেটির আত্মবিশ্বাস যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা প্রকাশ পায়।
প্রয়োজন এখনই পদক্ষেপ:
আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই:
১. প্রান্তিক পর্যায়ের হাইস্কুলগুলোকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করার দ্রুত পদক্ষেপ নিন।
২. শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য সুলভ বা ভর্তুকিযুক্ত পরিবহনের ব্যবস্থা করুন।
৩. ভর্তির ক্ষেত্রে কেবল জিপিএ নয়, বরং শিক্ষার্থীর ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দিন।
শিক্ষা যেন কেবল বিত্তবানের বিলাসিতা না হয়। শিক্ষা যেন হয় বেঁচে থাকার শক্তি। শালমারা থেকে ৮০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাওয়া সেই শিক্ষার্থীটি যখন মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়, তখন একটি সম্ভাবনাময় জীবনের মৃত্যু ঘটে। আমরা চাই না মেধার অপচয় হোক, আমরা চাই না দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার পথ রুদ্ধ হোক। শিক্ষা হোক সহজ, সুলভ এবং সবার জন্য সমান।
