121
ছবি: বাংলাপিডিয়া

লেখক: নীরব স্বর

বাংলার রাজনীতিতে একটি নাম আজও নানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন, আবার সমালোচকেরা তাঁকে স্মরণ করেন একজন স্বৈরশাসক হিসেবে, যাঁর শাসনকাল গণতন্ত্রের পথকে দীর্ঘ সময়ের জন্য রুদ্ধ করে রেখেছিল। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—বাংলা কেন আজও তাঁকে স্মরণ করে, এবং কোন বাস্তবতায় এই স্মরণ শ্রদ্ধা না বিতর্কের রূপ নেয়?

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। সংবিধান স্থগিত, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং সামরিক আইন জারির মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শাসনকাল। এই সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন এবং রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনেও এই সময়ের নানা নিপীড়নের চিত্র উঠে আসে।

তবে এরশাদ শাসনামল শুধু দমন-পীড়নের গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সমর্থকেরা উল্লেখ করেন, এই সময়ে উপজেলা ব্যবস্থা চালু, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, গ্রাম আদালত কার্যক্রম এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার তাঁর শাসনামলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কি গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের মূল্য পরিশোধের মতো গ্রহণযোগ্য ছিল?

এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন, যা রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল, যার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক বৈধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমর্থকেরা আবার এটিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনুভূতির প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই সিদ্ধান্ত আজও সংবিধান ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করে। ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই পতন প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

ক্ষমতা হারানোর পরও এরশাদ রাজনীতি থেকে সরে যাননি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এখানেই নতুন প্রশ্ন উঠে—একজন সাবেক স্বৈরশাসক কীভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকেন? এটি কি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা, না বাস্তবতার সঙ্গে আপস করার প্রবণতা?

বাংলা আজও তাঁকে স্মরণ করে—কেউ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে, কেউ আবার গণতন্ত্র ধ্বংসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে। এই দ্বৈত স্মরণই প্রমাণ করে, এরশাদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক চরিত্র নন, বরং তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীরভাবে বিতর্কিত অধ্যায়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থাকে—রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় গৃহীত কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ কি গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের দায় মুছে দিতে পারে? ইতিহাস কি কেবল ফলাফল দেখে বিচার করে, নাকি পথটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ? হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের বাধ্য করে।

By Md. Rejon Mia

দৈনিক জনকামনা (Daily JonoKamona)-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থ প্রকাশে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অনলাইন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে আসছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed