স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার যে অভূতপূর্ব আবেগীয় মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা এবার প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী কূটনৈতিক রূপ নিতে যাচ্ছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বন্ধনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে বাংলাদেশের নামে একটি সড়কের নামকরণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা। একই সাথে, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কোটি ফুটবল ভক্তদের উন্মাদনা ও সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে আর্জেন্টিনা থেকে ৪ জন অত্যন্ত জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ব্লগার বাংলাদেশে আসছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসার এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। বৈঠকে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কূটনৈতিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ, লালন ও স্প্যানিশ অনুবাদ
বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেন, “আমরা আর্জেন্টিনার মানুষ মূলত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই সবচেয়ে বেশি চিনি। তবে আমরা বাংলাদেশের অন্যান্য গুণী লেখকদের সম্পর্কেও বিশদভাবে জানতে অত্যন্ত আগ্রহী।” তিনি বাংলাদেশের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ও আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট লালন শাহের গান স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। একই সাথে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ‘বুয়েনস আইরেস আন্তর্জাতিক বইমেলা’য় বাংলাদেশকে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি ও বুয়েনস আইরেসে সড়ক
বৈঠকে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আর্জেন্টিনার অনন্য সমর্থন ও ১৯৭২ সালে অন্যতম প্রথম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতির কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পারস্পরিক সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও বহুমুখী করতে বদ্ধপরিকর।
দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ‘সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি’র খসড়া দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম বিনিময়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাউল ও লোক ঐতিহ্যের সাথে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ট্যাঙ্গো ও চ্যামামে নৃত্যের মেলবন্ধন ঘটবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অমর করে রাখতে আর্জেন্টিনার রাজধানীতে বাংলাদেশের নামে সড়ক নামকরণের পাশাপাশি দুই দেশের আবহাওয়ার সামঞ্জস্য বিবেচনা করে বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যবাহী দেশীয় উদ্ভিদ আর্জেন্টিনায় রোপণের পরিবেশবান্ধব প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
আসছেন আর্জেন্টিনার ইনফ্লুয়েন্সাররা
দুই দেশের জনগণের সংযোগ আরও জোরদার করতে রাষ্ট্রদূত জানান, চলমান ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে আর্জেন্টিনা থেকে চারজন অত্যন্ত জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ব্লগারকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই দল বাংলাদেশে অবস্থান করে এখানকার আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের কোটি ভক্তদের উন্মাদনা ও ভালোবাসা নিয়ে বিশেষ ভ্লগ তৈরি করবেন, যা আর্জেন্টিনায় ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে। এছাড়া দুই দেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে একটি জাঁকজমকপূর্ণ যৌথ ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তার প্রশংসা করে এই প্রস্তাবসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নে দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।