117

আমাদের যাপিত জীবনে অভ্যস্ততা এক অদ্ভুত ব্যাধি। কোনো কিছু যদি দীর্ঘকাল আমাদের ওপর চাপিয়ে রাখা হয়, তবে একসময় আমরা তার পেছনের কারণ বা যৌক্তিকতা ভুলে গিয়ে সেটাকেই নিজের সংস্কৃতি বলে আঁকড়ে ধরি। ইংরেজি নববর্ষ তেমনি এক অভ্যস্ততার নাম। প্রতি বছর যখন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে আতশবাজির শব্দে আকাশ প্রকম্পিত হয়, তখন কি আমরা একবারও ভাবি—এই উৎসবের শেকড় কোথায়? কেন আমরা নিজের পঞ্জিকাকে আলমারিতে তুলে রেখে অন্যের ক্যালেন্ডারকে জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়ে ফেলেছি?

 

​সম্রাট আকবরের ‘ফ্রেম’ ও কৌশলী বিবর্তন

​ইতিহাসের গলিঘুঁজি হাতড়ালে দেখা যায়, বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। তবে এই প্রবর্তনের পেছনে কেবল খাজনা আদায়ের সুবিধাই ছিল না, ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য। উপমহাদেশের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে যাতে আরবি হিজরি সন বা ইসলামী সংস্কৃতি একক প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে, সেজন্য সম্রাট আকবর একটি আঞ্চলিক ‘ফ্রেম’ তৈরি করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ব্যবস্থা যা স্থানীয় হিন্দুদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে, আবার মুসলমানদের রাজকীয় প্রয়োজনেও আসবে। কিন্তু সেই ফ্রেমটি উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারল না।

 

​সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত সেই কাঠামোকে ব্রিটিশরা অত্যন্ত সুচারুভাবে নিজেদের স্বার্থে রূপান্তর করল। তারা বুঝতে পেরেছিল, এ অঞ্চলের মানুষের উৎসবপ্রিয় মনকে জয় করতে হলে সরাসরি আঘাত না করে বিকল্প কিছু দিতে হবে। ফলে তারা ইংরেজি নববর্ষকে প্রবর্তন করল এক ‘আপডেটেড ভার্সন’ হিসেবে। বাংলা সনকে জিয়ে রাখা হলো নামমাত্র উৎসবে, আর ইংরেজি সনকে বানিয়ে দেওয়া হলো দাপ্তরিক ও আভিজাত্যের প্রতীক।

 

​আন্তর্জাতিকতার দোহাই ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব ​বিদেশি শাসকরা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এ দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের মগজে একটি ধারণা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল—ইংরেজি হলো ‘আন্তর্জাতিক ভাষা’ ও ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’। তাই ইংরেজি সন-তারিখ গ্রহণ না করা মানেই হলো পিছিয়ে পড়া। আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজও সেই ফাঁদে পা দিলেন। ফলস্বরূপ, আজ আমরা ইংরেজি তারিখ ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারি না। অথচ এক অদ্ভুত স্ববিরোধীতা আমাদের রক্তে মিশে আছে। আমরা তারিখ মনে রাখছি ইংরেজি ক্যালেন্ডারে, কিন্তু দিন বা বারের নাম মনে রাখছি বাংলা নামে। এই যে অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি অবস্থা—এর চেয়ে বড় রম্য আর কী হতে পারে?

 

আমরা আধুনিকে হলাম না, আবার দেশিও থাকলাম না; মাঝখানে এক হাইব্রিড পরিচয়ে থমকে রইলাম। ​ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক হুজুগ ​আমাদের এই ‘গা ভাসিয়ে দেওয়া’ সংস্কৃতির প্রভাব ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের বারো মাসে তেরো পুজোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের একাংশকে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখার কৌতূহল থেকে হোক বা উৎসবের আমেজে—সেখানে উপস্থিত হয়ে নিজের ‘মুসলমানিত্ব’ কতটুকু অক্ষুণ্ণ রইল, তা ভাবার অবকাশটুকুও যেন সমাজ হারিয়ে ফেলেছে। উৎসব আর বিশ্বাসের মাঝখানের সীমারেখাটি ক্রমেই ধূসর হয়ে আসছে।

 

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া শাসন কাঠামো কেবল আমাদের প্রশাসনেই নয়, আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তাধারাতেও এক গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে।

​গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ও আত্মোপলব্ধি

​ইংরেজি নববর্ষের এই ব্যাপক বিস্তারের পেছনের ইতিহাস কেবল তারিখ পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল একটি জাতির মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার। আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও যে প্রশাসনিক কাঠামোয় বাস করছি, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্রিটিশ শাসনের ভূত লুকিয়ে আছে। বাংলা সনকে কোণঠাসা করে কেন ইংরেজিকে সর্বব্যাপী করা হলো, এর পেছনে কোনো ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা নিয়ে উচ্চতর গবেষণার সময় এসেছে।

 

​ইংরেজি নববর্ষ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে, তবে তার চেয়ে বেশি কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকার ব্যবহারিক মূল্য এবং আমাদের ঐতিহাসিক স্বকীয়তা। আমরা আজ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাই না, বরং অজান্তেই নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাই।

 

লেখক: আব্দুল কাদের 

সারিয়াকান্দি, বগুড়া।

By Md. Rejon Mia

দৈনিক জনকামনা (Daily JonoKamona)-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থ প্রকাশে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অনলাইন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে আসছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *