আর এম তুফান
“নির্বাচনে কে সরকার গঠন করবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন অনেক আগেই লিখে রাখা। এখন শুধু একটা গেম চলছে, আর আমরা সেটার দর্শক হয়ে বসে আছি।” সাবিত রিজওয়ানের এই কথাগুলো কোনো হঠাৎ আবেগী মন্তব্য নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক অনাস্থা ও নাগরিক হতাশার সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। তিনি যে বাস্তবতার কথা বলছেন, তা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হলেও অযৌক্তিক নয়।
নির্বাচন আদতে হওয়ার কথা জনগণের মতামত জানার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়। কিন্তু যখন ভোটের ফল আগেই নির্ধারিত বলে মানুষের বিশ্বাস জন্মায়, তখন নির্বাচন আর অংশগ্রহণের উৎসব থাকে না, হয়ে ওঠে আনুষ্ঠানিকতা। রিজওয়ানের বক্তব্য সেই শূন্যতার দিকেই আঙুল তোলে, যেখানে নাগরিকরা ভোটার না হয়ে ধীরে ধীরে দর্শকে পরিণত হন।
এই দর্শকত্বের সংস্কৃতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত হওয়া, বিরোধী মতের জায়গা সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাহীনতা জমতে জমতেই মানুষ রাজনীতিকে নিজের জীবন থেকে আলাদা করে দেখতে শুরু করেছে। ফলে ভোট মানে আর পরিবর্তনের সম্ভাবনা নয়, বরং আগে থেকে লেখা এক চিত্রনাট্যের শেষ দৃশ্য দেখার মতো অভিজ্ঞতা।
রিজওয়ানের কথার যুক্তি এখানেই। তিনি বলছেন না যে জনগণের ভোটের মূল্য নেই, বরং বলছেন, জনগণকে এমনভাবে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে যে তারা নিজের ভোটের ক্ষমতার ওপরই বিশ্বাস হারাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত, কারণ যেখানে নাগরিক আশা হারায়, সেখানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
তিনি যে “গেম”-এর কথা বলছেন, সেটি আসলে ক্ষমতার একটি মঞ্চায়ন। এখানে নিয়ম আছে, চরিত্র আছে, দৃশ্যপট আছে, কিন্তু দর্শকের হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা শুধু তাকিয়ে দেখে, আলোচনা করে, হতাশ হয়, আবার পরের দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করে। এই অবস্থাকে স্বাভাবিক করে তোলাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য, কারণ প্রশ্নহীনতা ক্ষমতার সবচেয়ে নিরাপদ আবহ।
রিজওয়ানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি বলেছেন সবাই এই খেলাটা বুঝতে পারছে না। এর মানে এই নয় যে মানুষ বুদ্ধিহীন, বরং বাস্তবতা এতটাই ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে বদলেছে যে অনেকেই সেটাকে আর অস্বাভাবিক বলে মনে করেন না। যখন সীমিত অংশগ্রহণ, একপাক্ষিক নির্বাচন আর আগাম নির্ধারিত ফলাফল দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন সেটাই নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়।
এই বাস্তবতায় রিজওয়ানের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং নাগরিক মনোবৃত্তির বিশ্লেষণও। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সমস্যাটা শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে নয়, সমস্যাটা সমাজের মনোজগতে, যেখানে মানুষ নিজের অধিকার হারালেও সেটাকে আর হারানো বলে মনে করে না।
তার কথার সবচেয়ে শক্ত যুক্তি হলো, নির্বাচন যখন প্রতিযোগিতার বদলে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র তার অর্থ হারায়। তখন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আর জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন থাকে না, বরং ক্ষমতার ধারাবাহিকতার যান্ত্রিক রূপে পরিণত হয়। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
রিজওয়ানের বক্তব্য তাই কোনো আবেগী হতাশা নয়, বরং একটি সতর্ক উচ্চারণ। তিনি বলতে চেয়েছেন, যদি আমরা ভোটকে শুধু দেখার বিষয় বানিয়ে ফেলি, অংশগ্রহণের বিষয় না রাখি, তাহলে আমরা নিজেরাই ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে দর্শকে রূপান্তরিত হয়ে যাব। আর তখন নির্বাচন থাকবে, ব্যালট থাকবে, ফলাফলও থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র থাকবে না।