আর এম তুফান
নবীনগর যাওয়ার পথে বাংলাদেশ ক্রিয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে পৌঁছালেই টের পাওয়া যায়, বাতাস আর আগের মতো নেই। প্রথমে নাকে ধাক্কা দেয়, তারপর চোখে পড়ে। মুহূর্তেই বোঝা যায়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন আবর্জনার স্তূপ নয়, বরং দীর্ঘ অবহেলার ঘনীভূত রূপ। তখন অজান্তেই মনে প্রশ্ন জাগে, রাজধানীর ময়লার শেষ ঠিকানা কি তবে এই জায়গাটিই?
এই অংশটুকু পার হওয়া মানে স্বাভাবিকতা থেকে খানিকটা ছিটকে যাওয়া। জানালা বন্ধ হয়, মুখ ঢেকে নেওয়া হয়, কথাবার্তা থেমে যায়। কিন্তু গন্ধের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে সেই নীরব প্রশ্ন, কেন শহরের মাঝখানে এমন জায়গা বছরের পর বছর টিকে থাকে, আর আমরা কেন ধীরে ধীরে এটাকে সহনীয় বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শিখে যাই।
এখানকার বর্জ্য শুধু রান্নাঘরের উচ্ছিষ্টে সীমাবদ্ধ নয়। চোখে পড়ে পলিথিন, প্লাস্টিক, ভাঙা ইট-পাথর, নির্মাণসামগ্রী, এমনকি এমন কিছু বর্জ্যও, যেগুলোর থাকার কথা নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায়। খোলা জায়গায় পড়ে থেকে এগুলো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এক ধরনের বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, যার প্রভাব সরাসরি চোখে না পড়লেও বাতাস, পানি আর মাটির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে। যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানে কেবল ময়লা সরিয়ে কোথাও ফেলে দেওয়া, সেখানে এই ধরনের জায়গা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। পরিকল্পিত ল্যান্ডফিল, পুনর্ব্যবহার কিংবা পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকলে শহরের প্রান্তবর্তী এলাকাগুলোই শেষ পর্যন্ত নগরের বোঝা বইতে বাধ্য হয়।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো, এই জায়গার আশপাশেই রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি এবং ব্যস্ত চলাচলের সড়ক। মানুষ প্রতিদিন এই দূষণের ভেতর দিয়েই হাঁটে, যাতায়াত করে, শ্বাস নেয়। বিষয়টি তখন আর শুধু সৌন্দর্যের প্রশ্ন থাকে না, হয়ে ওঠে স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং নাগরিক জীবনের মানের প্রশ্ন।
এই রাস্তার অংশটুকু তাই কেবল দুর্গন্ধের গল্প নয়, এটি আমাদের নগরচিন্তার সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। এটি মনে করিয়ে দেয়, আমরা উন্নয়ন নিয়ে যত কথা বলি, বর্জ্য নিয়ে ভাবতে ততটাই অস্বস্তি বোধ করি। অথচ শহরের পরিচ্ছন্নতা মাপা যায় না শুধু উঁচু ভবন আর প্রশস্ত সড়কে, মাপা যায় তার ফুটপাত, বাতাস আর নীরব কোণগুলোতে জমে থাকা বাস্তবতায়।
নবীনগরগামী এই পথ তাই প্রতিদিন আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, আমরা কি সত্যিই শহর গড়ে তুলছি, নাকি কেবল সমস্যা সরিয়ে রেখে আরও বড় সমস্যার জায়গা তৈরি করছি?