নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল, তা দীর্ঘ ১৯০ বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই সুদীর্ঘ সময়ে একদিকে যেমন প্রশাসনিক আধুনিকায়ন ও জমিদারি প্রথার মাধ্যমে নতুন এক অভিজাত শ্রেণির জন্ম হয়েছে, ঠিক তেমনি ব্রিটিশদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছিল তীব্র প্রতিরোধের চেতনা।
কোম্পানি শাসনের সূচনা ও দেওয়ানি লাভ
পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরকে নামমাত্র নবাব বানিয়ে ইংরেজরা বাংলার প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের আইনি ক্ষমতা লাভ করেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে সরাসরি ব্রিটিশ রাজ পরিবারের (Crown) শাসন শুরু হলে এই ঔপনিবেশিক শাসন এক নতুন রূপ পায়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি শাসন
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদাররা জমির স্থায়ী মালিকানা লাভ করে এবং ইংরেজদের নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে।
প্রভাব: এই প্রথা গ্রামীণ সমাজে এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী জমিদার শ্রেণি তৈরি করে। এই জমিদাররা ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে কাজ করত এবং রাজস্ব আদায়ের নামে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত কর ও অত্যাচার বৃদ্ধি করত। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমে দুর্বল হতে থাকে এবং সাধারণ কৃষক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়।
নীল চাষ ও কৃষক বিদ্রোহ
ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম কালো অধ্যায় ছিল বাধ্যতামূলক নীল চাষ। কৃষকদের উর্বর জমিতে শস্যের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত লাভজনক ব্রিটিশদের জন্য কিন্তু কৃষকদের জন্য ছিল সর্বনাশা। অতিরিক্ত ভূমি রাজস্ব এবং জমিদার ও নীলকরদের শোষণের প্রতিবাদে বাংলার প্রান্তিক মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
সশস্ত্র প্রতিরোধ ও জাতীয় জাগরণ
ব্রিটিশ শোষণ ও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে বাংলায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংঘটিত হয়:
১. ফরায়েজী আন্দোলন: হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তাঁর পুত্র দুদু মিয়া ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
২. তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা: জমিদার ও ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিতুমীর নারকেলবাড়িয়ায় তাঁর ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করেন।
৩. নীল বিদ্রোহ: কৃষকরা দলবদ্ধভাবে নীল চাষ করতে অস্বীকার করে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেয়।
৪. সাঁওতাল ও পাগলপন্থী বিদ্রোহ: শোষক মহাজন ও জমিদারদের হাত থেকে মুক্তি পেতে প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ে নামে।
ব্রিটিশদের নিয়ে আসা ‘ঔপনিবেশিক আধুনিকতা’ (Colonial Modernity) স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রথাকে বিপন্ন করলেও, এই শোষণই বাঙালির মধ্যে দেশপ্রেম এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করেছিল। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশবিভাগ পর্যন্ত—বাংলার মানুষের এই প্রতিরোধের ইতিহাস আজও আমাদের গর্বের প্রতীক।