মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম ধারক পাহাড়ি অঞ্চলগুলো আজ ক্রমেই মানুষের লোভের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া এলাকায় অব্যাহত পাহাড় ও মাটি কাটার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা লাভ করেছে। প্রশাসনের অভিযান, পরিবেশবাদীদের সতর্কতা এবং আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই ধ্বংসযজ্ঞ থামছে না। ফলে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং জননিরাপত্তা সবকিছুই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

পাহাড় কেবল মাটির উঁচু স্তূপ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ব্যবস্থা। পাহাড় বৃষ্টির পানি ধারণ করে, ভূমিধস প্রতিরোধ করে, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। অথচ ইটভাটা, আবাসন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে নির্বিচারে পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার প্রবণতাও বেড়েছে।

লোহাগাড়ার বিভিন্ন এলাকায় রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের বেলাতেই প্রকাশ্যে চলছে মাটি ও পাহাড় কাটার কাজ। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাহাড়ের বুক চিরে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টির মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিধসে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও যেন শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে না।

পরিবেশ ধ্বংসের এই কর্মকাণ্ডের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। পাহাড়ি বনাঞ্চল ও গাছপালা ধ্বংস হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ায় কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জলাধার ও খাল-বিল ভরাট হয়ে স্থানীয় পানি প্রবাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, এত আইন-কানুন থাকার পরও কেন এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না? এর পেছনে রয়েছে অসাধু চক্রের প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে দায়সারা মনোভাব। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন স্পষ্টভাবে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে যে পাহাড় রক্ষা মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা কোনো টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না।

লোহাগাড়ার পাহাড় ও মাটি কাটা বন্ধ করা আজ শুধু পরিবেশ রক্ষার দাবি নয়। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই নীরব যুদ্ধ বন্ধ না হলে একদিন এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে সবাইকে। এখনই সময় পাহাড় বাঁচানোর, প্রকৃতি রক্ষার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার। নইলে উন্নয়নের স্বপ্নের আড়ালে আমরা হারিয়ে ফেলব আমাদের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *