নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের চাবি কার হাতে? সরকার বলছে জনগণের হাতে। কিন্তু সেই জনগণের পকেট কি এখন শূন্য? সাধারণ মানুষের জীবন কি এখন কেবলই টিকে থাকার সংগ্রাম? এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের টেবিলে জমা পড়া চিঠির পাহাড় দেখে।
দেশজুড়ে চলা ‘ভোটের গাড়ি’র প্রচারণায় রাখা ‘জনমত বাক্সে’ গত কয়েকদিনে জমা পড়েছে ৪০ হাজার ২০৬টি চিঠি। এই চিঠিগুলো কোনো দাপ্তরিক আবেদন নয়, এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর আগামীর স্বপ্ন।
সিন্ডিকেটের কবলে সাধারণ মানুষের থালা চিঠিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাহাকার ঝরেছে দ্রব্যমূল্য নিয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ের এক দিনমজুরের পাঠানো চিরকুটটি নাড়িয়ে দিয়েছে খোদ প্রধান উপদেষ্টাকেও। সেই দিনমজুর লিখেছেন, “গরিব মানুষ, দিনমজুরি করে খাই। বাজারে সিন্ডিকেট চলছে। আমরা গরুর মাংস কিনে খেতে পারি না।” পিরোজপুর থেকে আসা এক চিঠিতে লেখা হয়েছে, “সিন্ডিকেট ভাঙুন, আমাদের বাঁচার সুযোগ দিন।”
১০ বছরের রাফার ‘ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ’ কেবল বড়রা নয়, ড. ইউনূসের কাছে চিঠি লিখেছে ১০ বছরের রাফাও। গাজিপুরের এই ছোট্ট শিশুটি কোনো খেলনা বা উপহার চায়নি। সে লিখেছে, “ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আমি নিরাপদ মাটি ও বাতাসের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই। এমন মানুষ তৈরি করুন যারা আমাদের কথা ভাববে।”
জুলাইয়ের রক্ত আর বিচারহীনতার ভয় চিঠির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কথা। দিনাজপুর থেকে লিজা, বিপাশা ও সুমিরা লিখেছেন, “জুলাইয়ের রক্ত যেন বৃথা না যায়। অপরাধীদের কঠোর বিচার চাই এবং নারী-শিশুর জন্য নিরাপদ দেশ চাই। ধর্ষণের রায় যেন ১০ দিনের মধ্যে হয়।” কেন এই জনবিস্ফোরণ? পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ২১৬টি চিঠি এসেছে। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তারা কথা বলতে চায়। কেউ লিখেছেন বৈষম্যহীন অফিসের কথা, কেউ চেয়েছেন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, আবার কেউবা সরাসরি আক্রমণ করেছেন বর্তমান প্রশাসনের ধীরগতিকে।
ড. ইউনূসের নির্দেশ: ‘কোনো সমালোচনাও কাটছাঁট নয়’ মানুষের এই অকৃত্রিম আবেগ দেখে অভিভূত প্রধান উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাগুলো তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, প্রশাসনের নিন্দা বা কড়া সমালোচনা করা হয়েছে—এমন একটি চিঠিও যেন ফেলে দেওয়া না হয়। সব চিঠি সংরক্ষণ করে জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে চান তিনি।
জনগণের এই ৪০ হাজার চিঠি কি পারবে আগামীর বাংলাদেশকে বদলে দিতে? নাকি এই প্রত্যাশার পাহাড় আবারও কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে যাবে? উত্তর দেবে সময়।