208

নিজস্ব প্রতিবেদক

​উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। এই আন্দোলনের অগ্নিশিখা যখন মিরাট ও দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সুদূর চট্টগ্রামেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন জনৈক এক সাহসী সিপাহী— হাবিলদার রজব আলী খাঁ। ১৮ নভেম্বর আজ সেই ঐতিহাসিক দিন, যখন চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল বিপ্লবীদের পদভারে।

​বিদ্রোহের সেই উত্তাল ৩০ ঘণ্টা

১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর রাত। চট্টগ্রামে ব্রিটিশ নেটিভ বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির ৩৪ নম্বর রেজিমেন্টের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ কোম্পানির সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। নেতৃত্বে ছিলেন ৪ নম্বর কোম্পানির হাবিলদার রজব আলী খাঁ।

​বিদ্রোহের সূচনা হয় পাহাড়তলী সংলগ্ন প্যারেড গ্রাউন্ড এলাকা থেকে। বিদ্রোহীরা প্রথমে কারাগারের তালা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করেন এবং সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ ও অস্ত্র লুট করে ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ জানান। বিদ্রোহীদের সাহসিকতার মুখে চট্টগ্রামের শ্বেতাঙ্গ শাসকরা প্রাণভয়ে কর্ণফুলী নদীতে রাখা জাহাজে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৩০ ঘণ্টা চট্টগ্রাম শহর সম্পূর্ণ ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল এবং বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

​আন্দরকিল্লা ও শাহী জামে মসজিদের ভূমিকা

বিদ্রোহের এক পর্যায়ে রজব আলী খাঁ ও তার বাহিনী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ এলাকায় অবস্থান নেন। ব্রিটিশদের সাথে এই এলাকায় বিদ্রোহীদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। অনেক বিপ্লবী শাহাদাত বরণ করেন, যাদের এই মসজিদের প্রাঙ্গণেই দাফন করা হয়। এই লড়াই শুধু সামরিক বিদ্রোহ ছিল না, বরং তা ছিল গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

​রজব আলী খাঁ: পরিচয় ও অস্পষ্ট ইতিহাস

হাবিলদার রজব আলীর জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন তার আদি নিবাস সন্দ্বীপে, আবার কেউ পটিয়া বা লোহাগাড়ার কথা বলেন। তবে তার পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে তার বিপ্লবী সত্তা। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং সিপাহীদের মধ্যে তিনি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

​কেন রজব আলী খাঁ আজও প্রাসঙ্গিক?

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা—যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলছিল, তাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন রজব আলী খাঁ। তার এই সশস্ত্র বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে, প্রশিক্ষিত ব্রিটিশ বাহিনীও অজেয় নয়।

​আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মানবাধিকারকর্মী ও ইতিহাসবিদদের দাবি, এই বীরের স্মৃতি ধরে রাখতে চট্টগ্রামের প্যারেড গ্রাউন্ডের নামকরণ এবং পাঠ্যপুস্তকে তার বীরত্বগাথা অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

By Md. Rejon Mia

দৈনিক জনকামনা (Daily JonoKamona)-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। সত্য, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জনস্বার্থ প্রকাশে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অনলাইন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে আসছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *