নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থি ১১ দলীয় জোটে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আল্লামা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য। এ কারণে নির্ধারিত যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়, যা জোটের ভেতরের অস্বস্তিকে সামনে এনে দিয়েছে।
বুধবার সকালে রাজধানীতে ১১ দলের পক্ষ থেকে আসন সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকলেও বিকেলের আগেই তা বাতিল করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জোটভুক্ত দলগুলোর কে কোন আসনে নির্বাচন করবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হওয়ার কথা ছিল।
জোট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মূলত আসন সংখ্যার বিষয়ে একমত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঐক্যমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে, অন্যদিকে জামায়াত নিজেদের প্রাধান্য বজায় রেখে সীমিত আসন ছাড় দিতে আগ্রহী।
আসন বণ্টনেই মূল সংকট
ইসলামী আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, দলটি শুরুতে বড় পরিসরে আসনের দাবি তুললেও বর্তমানে তারা অন্তত ৬৫ থেকে ৭০টি আসনে নির্বাচন নিশ্চিত করতে চায়। বিপরীতে জামায়াত সর্বোচ্চ ৪৫টি আসন ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই ব্যবধান ঘিরেই মূলত আলোচনা থমকে আছে।
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। দলটি মনে করছে, মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সক্রিয়তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলন স্থগিত, তবে আলোচনা চালু
সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়ে জোটের সমন্বয়কারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে “অনিবার্য কারণ”-এর কথা বললেও ভেতরের আলোচনা বলছে, চরমোনাই পীর ও মামুনুল হক উভয়েই প্রার্থী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত মঞ্চে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এতে জোট ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হলে জামায়াত শেষ পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই সময় আবেগ নয়, প্রজ্ঞার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
নতুন জোটের ইঙ্গিত?
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে। তিনি জানান, দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সমঝোতা মানে একতরফা চাপ মেনে নেওয়া নয়। পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতা না থাকলে ঐক্য টেকসই হয় না।
শুরা বৈঠকে দ্বিধা
ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিসে শুরার বৈঠকেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেক নেতা মত দিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করা প্রার্থীদের নির্বাচন করার সুযোগ না দিলে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। আবার কেউ কেউ জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
একই অবস্থান দেখা গেছে খেলাফত মজলিসের ভেতরেও। দলটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আশাবাদী হলেও নিজেদের ন্যূনতম রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করতে চায়।
অনিশ্চয়তায় ইসলামপন্থি ঐক্য
সব পক্ষই প্রকাশ্যে বলছে, জোট ভাঙার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে চলমান অচলাবস্থা ইসলামপন্থি ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই জট কাটবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন।