
সাবিত রিজওয়ান
একটি গল্প কীভাবে জন্ম নেয়? প্রাত্যহিক জীবনের কোনো একটি ছোট দৃশ্য, স্মৃতির ধুলোবালি কিংবা মনের কোণে জমে থাকা হাহাকার থেকেই গল্পের সূত্রপাত। তবে সেই ভাবনাকে একটি সার্থক গল্পে রূপ দিতে কিছু কলাকৌশল ও কাঠামোর প্রয়োজন হয়। নবীন বা অভিজ্ঞ: যেকোনো লেখকের জন্য গল্প নির্মাণের পাঁচটি মৌলিক ধাপ বলতে পারি।
১. পর্যবেক্ষণে চোখ, কল্পনায় মন
একজন লেখকের প্রথম কাজ চারপাশটা মনোযোগ দিয়ে দেখা। পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে যা অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তা কেবল গ্রহণ করলেই চলে না; তার ওপর কল্পনার রঙ চড়াতে হয়। বাসে বসে থাকা অচেনা মানুষটির চিন্তিত মুখ দেখে তার পেছনের গল্পটি কল্পনা করে নেওয়ার নামই সাহিত্যিক মেধা। বাস্তবতাকে ভিত্তি বানিয়ে তার ওপর মেধা ও উপমার ছোঁয়া দিয়ে নতুন জগত সৃষ্টি করাই গল্পকারের কাজ।
২. চরিত্রকে জীবিত করে তোলা
গল্পের প্রাণ হলো তার চরিত্র। চরিত্র নির্মাণের সময় তার বয়স, চেহারা, সামাজিক অবস্থানের পাশাপাশি তার ভেতরের দুর্বলতা ও আকাঙ্খাকে স্পষ্ট করতে হবে। চরিত্রটি আসলে কী চায়: সম্মান, ভালোবাসা নাকি ক্ষমা? তার চাহিদাই গল্পের গতিপথ ঠিক করে দেয়। আর এই চাওয়া পূরণ করতে গিয়েই তৈরি হয় বাধা বা দ্বন্দ্ব। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই দ্বন্দ্ব যেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া না হয়; চরিত্রের আচরণ থেকেই যেন তা স্বাভাবিকভাবে ফুটে ওঠে।
৩. আকর্ষণীয় শুরু ও ভিন্নধর্মী সমাধান
গল্পের সূচনা হতে হবে পাঠককে আটকে ফেলার মতো কোনো মুহূর্ত দিয়ে। গতানুগতিক ভূমিকা না টেনে সরাসরি মূল ঘটনা বা সমস্যার ভেতরে ঢুকে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ। সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রেও লেখকের চমক দেওয়া প্রয়োজন। প্রথম যে সমাধানটি মাথায় আসে, সেটি সাধারণত পাঠকও আঁচ করতে পারে। তাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো ব্যতিক্রমী উপায়ের দিকে হাঁটা উচিত।
৪. ভাষার পরিমিতি ও একমুখী প্রবাহ
ছোটগল্পের শক্তি নিহিত থাকে তার সংক্ষেপে। অনাবশ্যক রূপক বা বর্ণনার ঘনঘটা গল্পের রস নষ্ট করে। ভাষা সহজ, সাবলীল ও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাষার ধারাবাহিকতা: সাধু, চলিত কিংবা আঞ্চলিক, যে রীতিতেই গল্প লেখা হোক না কেন, পুরো লেখাটিতে সেই এক রীতির আবহ ধরে রাখতে হবে।
৫. শেষ হয়েও না হওয়া
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ছোটগল্পের মূল মন্ত্র…”শেষ হয়ে হইলো না শেষ”। সার্থক ছোটগল্প পাঠককে একটি অতৃপ্তির দোলাচলে রেখে শেষ হয়। সব প্রশ্নের উত্তর লেখক নিজে না দিয়ে কিছু ভাবনা পাঠকের কল্পনার ওপর ছেড়ে দিতে হয়।
হুট করে একদিনে কেউ লেখক হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পঠন, ধৈর্য এবং লেখার চর্চা। ভালো লেখকদের লেখা কেটেছেঁটে তার গঠনশৈলী বোঝা এবং তা ভেঙে নিজের একটা নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করাই হলো সাহিত্যিক হয়ে ওঠার আসল চাবিকাঠি।
