123

, নরসিংদী প্রতিনিধি :

আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন’- নয় বছরের শিশু তুলি পালের সরল এই আবদার ছুঁয়ে গেছে মানবিকতার অনুভূতি। নিজের জন্য কিছু না চেয়ে শতবর্ষী, অসুস্থ ও দৃষ্টিহীন দিদির চলাফেরার কষ্ট লাঘবে একটি ‘গাড়ি’ চেয়েছিল সে। তুলির সেই ‘গাড়ি’ চাওয়াই শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়েছে হুইলচেয়ারে।

গতকাল নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে খালি গায়ে হাজির হয় তুলি। কারও কাছে শুনেছিল, ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই আশায় নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অসুস্থ দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে ছুটে আসে শিশুটি।

মানবিক ইউএনও মো. মাসুদ রানার কাছে গিয়ে সরল কণ্ঠে তুলি বলে, ‘আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।’ শিশুটির মুখে এমন কথা শুনে তাকে কাছে ডেকে নেন ইউএনও। জানতে চান তার পরিবার ও দিদির বিষয়ে। কথায় কথায় বেরিয়ে আসে তাদের জীবনের অভাব-অনটন ও বঞ্চনার গল্প।

তুলি রায়পুরা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বাবা নিরঞ্জন, ভাই মহাদেবসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকে। তার বাবা পেশায় জেলে। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রায় তিন-চার বছর আগে মাকে হারিয়েছে তুলি।

তবে নিজের কষ্টের চেয়েও দিদির অসহায়ত্বই বেশি ভাবায় তাকে। শতবর্ষী দিদি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। চোখেও দেখতে পান না। হাঁটাচলাও প্রায় অসম্ভব। দিদিকে একটু স্বস্তিতে চলাফেরা করাতে তাই হুইলচেয়ারের কথা শুনে ইউএনওর কাছে চলে আসে তুলি।
সেদিন তুলির সঙ্গে ছিল তার ফোফাত ভাই কৃষ্ণও। তার জীবনেও রয়েছে বঞ্চনার ছাপ। কৃষ্ণের মা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় মায়ের স্নেহ থেকেও বঞ্চিত সে। দুই শিশুর জীবনের এই বাস্তবতা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।

তুলির কথা শুনে দেরি করেননি ইউএনও মো. মাসুদ রানা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি তুলি ও কৃষ্ণের জন্য নতুন পোশাকও কিনে দেওয়া হয়।

নতুন জামা পরে দিদির জন্য হুইলচেয়ার সঙ্গে নিয়ে যখন বাড়ির পথে রওনা দেয় তুলি, তখন তার মুখে ফুটে ওঠে নির্মল আনন্দের হাসি। উপজেলা প্রশাসনের কর্মীরা পরে রিকশায় করে তুলি, কৃষ্ণ ও হুইলচেয়ারটি তাদের হরিপুরের বাসায় পৌঁছে দেন।

তুলির সেই হাসিতে ছিল অন্যরকম তৃপ্তি। নিজের জন্য নতুন জামা পাওয়ার আনন্দের চেয়েও দিদির কষ্ট কিছুটা কমবে- এই ভাবনাই যেন তাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে।

এ বিষয়ে ইউএনও মো. মাসুদ রানা বলেন, “তুলি পাল কারও কাছে শুনেছিল, ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই আশায় খালি গায়ে হন্তদন্ত হয়ে তার প্রতিবন্ধী দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে আমার কাছে চলে আসে। এসে সরলভাবে বলে, ‘আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।’ কথোপকথনে জানতে পারি, তার মা নেই এবং দিদি হাঁটতে পারেন না। বিষয়টি শুনে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করি। একই সঙ্গে তার সঙ্গে আসা কৃষ্ণ নামের শিশুটিসহ দুজনের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “খালি গায়ে আসা দুই শিশু যখন নতুন জামা পরে, দিদির জন্য হুইলচেয়ার নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়, তখন তাদের মুখে যে আনন্দ দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। অফিসের স্টাফদের সঙ্গে নিয়ে রিকশায় করে তাদের রায়পুরা পৌরসভার হরিপুরের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। নতুন জামা ও দিদির জন্য হুইলচেয়ার পেয়ে তুলির মায়াভরা হাসি কোনোদিন ভোলার নয়। তুলির জন্য শুভকামনা। ভালো থাকুক তুলিরা।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি হুইলচেয়ার হয়তো বড় কোনো আয়োজন নয়। কিন্তু নিজের প্রয়োজন ভুলে অসুস্থ দিদির জন্য একটি ‘গাড়ি’ চেয়ে নয় বছরের শিশুর করা আবদারের মানবিক মূল্য অনেক বেশি। তুলির সেই আবদারে সাড়া দিয়ে উপজেলা প্রশাসনও মানবিকতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

অভাব-অনটনের মধ্যেও ভালোবাসা যে হারিয়ে যায় না, বরং কখনো কখনো তা শিশুর সরল আবদারেই সবচেয়ে নির্মলভাবে প্রকাশ পায়-তুলির গল্প যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।