​ব্যুরো প্রধান খুলনাঃ

বাগেরহাটের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সেফটি অ্যান্ড স্টোর ম্যানেজার সুজন ইসলামের বিরুদ্ধে চাকরি বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া হাজিরা ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা প্রতিকার ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
​অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আউটসোর্সিংয়ের কর্মী হিসেবে কর্মরত সুজন ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শ্রমিকদের জিম্মি করে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছেন। তার বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া হাজিরা তৈরি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তার পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট নেতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
​চাকরিতে পুনর্বহালের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও হুমকি
​রামপাল উপজেলার মানিকনগরের বাসিন্দা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবেক কর্মী মো. মামুন অভিযোগ করেন, চাকরিতে পুনর্বহালের কথা বলে সুজন ইসলাম তার কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও চাকরি না দিয়ে উল্টো টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্নভাবে হুমকি-ডমকি দেওয়া হচ্ছে। সুজন ও তার সহযোগীদের ভয়ে বর্তমানে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন উল্লেখ করে রামপাল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন মামুন।
​একই ধরনের অভিযোগ এনে রাজনগরের বাসিন্দা ও সাবেক কর্মী আসাদুজ্জামান রামপাল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, চাকরিতে পুনর্বহালের আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকেও ৪৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সুজন ইসলাম। টাকা নেওয়ার পর এখন তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন।
​ভুয়া হাজিরা ও শ্রমিক জিম্মির অভিযোগ
​স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রামপাল ও মোংলা এলাকার আরও বহু মানুষ সুজন ইসলামের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। হাজিরা শিট সুজনের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, তিনি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অনেক অনুপস্থিত কর্মীর নিয়মিত ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করেন এবং সেখান থেকে বড় অঙ্কের কমিশন নেন। যারা তাকে নিয়মিত নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারেন, তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়; আর যারা অপরাগতা প্রকাশ করেন, তাদের চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় শ্রমিক জানান, চাকরি হারানোর ভয়ে ভেতরে ভেতরে চরম ক্ষোভ থাকলেও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
​নেপথ্যে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ!
​অভিযোগ উঠেছে, একজন সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মী হয়েও সুজন ইসলামের এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পেছনে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে। তাদের সাথে সুজনের বিশেষ সখ্যতা ও আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক থাকায় একের পর এক অভিযোগ উঠলেও তিনি সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা কোনো উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি যদি সুজন ইসলামকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে, তবে এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বড় বড় কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী নেপথ্য নায়কদের নামসহ আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ও থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
​অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
​এসব অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত সুজন ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
​”আমি ছোট চাকরি করি। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অসত্য। এখানে শত শত মানুষ কাজ করেন, কোনো কারণে দুই-একজন আমার ওপর সংক্ষুব্ধ হতেই পারেন।”
​অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত জিএম (অপারেশন) আহসান হাবিব বলেন,
​”সুজন আউটসোর্সিংয়ের একজন কর্মচারী। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট বা বিভাগ এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
​এদিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাধারণ শ্রমিক ও স্থানীয় সচেতন মহল এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *