
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের নাম ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’। দেশের প্রথম পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—এই ইউরেনিয়াম কি পরমাণু বোমা বানাতে ব্যবহৃত হতে পারে? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রূপপুরের জ্বালানি দিয়ে অস্ত্র তৈরির কোনো সুযোগই নেই।
ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ: বিদ্যুৎ ও বোমার মূল পার্থক্য
প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামের মধ্যে জ্বালানি হিসেবে কার্যকর ‘ইউ-২৩৫’ থাকে মাত্র ০.৭ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ‘সমৃদ্ধ’ (Enrich) করতে হয়। এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি: রূপপুরে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম মাত্র ৩-৫ শতাংশ সমৃদ্ধ। এটি একটি ধীর ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন বজায় রেখে বিদ্যুৎ তৈরি করতে সক্ষম, কিন্তু এতে কোনো বিস্ফোরণ ঘটানো অসম্ভব।
পারমাণবিক বোমা: একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়, যাকে ‘ওয়েপন গ্রেড’ বলা হয়। ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিশাল অবকাঠামোর প্রয়োজন, যা রূপপুরের বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নিউক্লিয়ার ফিশন ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায়। এখানে ইউরেনিয়ামের বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হয়। এটি একটি অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, বোমার কার্যপদ্ধতি সম্পূর্ণ বিপরীত—সেখানে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত করতে হয়, যার জন্য রূপপুরের চুল্লিতে কোনো প্রযুক্তি বা পরিবেশ বিদ্যমান নেই।
আইএইএ-এর কঠোর নজরদারি
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিয়ম অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পের প্রতিটি ফুয়েল রডের হিসাব রাখা হয়। বাংলাদেশ এই ইউরেনিয়াম কেবল বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আবদ্ধ। রাশিয়া থেকে আসা এই জ্বালানি ব্যবহারের পর তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও রয়েছে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রটোকল। ফলে প্রযুক্তি বা জ্বালানি সরিয়ে গোপনে অস্ত্র তৈরির কোনো অবকাশ এখানে নেই।
উপসংহার
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট সমাধানের একটি মাইলফলক। এটি কোনো ধ্বংসের হাতিয়ার নয়, বরং একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শক্তির উৎস। কাজেই রূপপুর নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই, এটি বাংলাদেশের উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত।
