ফিচার ডেস্ক
সময়টা ১৯৭১। যখন পৃথিবীর এক কোণে এক জাতি তাদের মাতৃভাষা আর জন্মভূমি রক্ষায় অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে, তখন আট হাজার কিলোমিটার দূরে বসে এক ভিনদেশী মানুষ ব্যথিত হচ্ছিলেন সেই রক্তের গন্ধে। তিনি জর্জ হ্যারিসন—বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি গিটারিস্ট এবং গায়ক। বিটলসের সেই চিরচেনা মুখটি কীভাবে হয়ে উঠলেন বাঙালির আজন্মকালের পরম বন্ধু, সেই ইতিহাস আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে।
পণ্ডিত রবি শঙ্কর ও বন্ধুত্বের টান ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি হ্যারিসনের ছিল অগাধ অনুরাগ। সেই সুবাদেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সেতার সম্রাট পণ্ডিত রবি শঙ্করের সঙ্গে। একাত্তরে যখন বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা আর এক কোটি মানুষের শরণার্থী হওয়ার খবর রবি শঙ্কর তাঁকে জানান, হ্যারিসন স্থির থাকতে পারেননি। তিনি অনুভব করেছিলেন, কেবল সমবেদনা নয়, প্রয়োজন বিশাল কোনো উদ্যোগের।
ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন ও ঐতিহাসিক সেই কনসার্ট হ্যারিসনের প্রচেষ্টায় ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ চ্যারিটি কনসার্ট—‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ৪০ হাজারের বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে সেই আয়োজন থেকে সংগৃহীত প্রায় ২,৪৩,৪১৮ মার্কিন ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়। বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন ও রিঙ্গো স্টারের মতো তারকারা সেদিন হ্যারিসনের ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
‘বাংলাদেশ’ গান ও বিশ্ব জনমত শুধু কনসার্ট নয়, হ্যারিসন রচনা করেন কালজয়ী গান—‘বাংলাদেশ’। এই গানের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে এই ভূখণ্ডের ওপর চলা অমানবিক নির্যাতনের কথা। রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ নয়, স্রেফ মানবিক তাগিদ থেকে তিনি সংগীতকে প্রতিবাদের ভাষা ও সহমর্মিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
বাঙালির হৃদয়ে অমর এক নাম স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা জানালেও, হ্যারিসনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো কোটি বাঙালির ভালোবাসা। যখন বড় বড় রাষ্ট্রগুলো একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে নীরব ছিল, তখন এই শিল্পী গিটার হাতে বিশ্বমঞ্চে বাঙালির পক্ষে গর্জে উঠেছিলেন।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জর্জ হ্যারিসন কেবল একজন ভিনদেশী গায়ক নন; তিনি আমাদের সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য এবং উজ্জ্বল মানবিক অধ্যায়। যাকে বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ রেজন মিয়া। সহ-সম্পাদক: মোঃ মাইদুল ইসলাম। লাইব্রেরি: তুফান ইনিস্টিউট। কার্যালয়: মিঠাপুকুর, রংপুর।
© ২০২৬ সময়প্রবাহ। লেখার দায় লেখকের; স্বত্ব কর্তৃপক্ষের। ভুল বা বিতর্কে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।